ছল শুধু দুষ্টের নয়, নব্য-লকডাউনে একেবারে আঁটোসাঁটো বন্দিত্ব থেকে কিঞ্চিৎ খোলা হাওয়ায় বেরনোর জন্য সাধারণ মানুষেরও যে বড্ড প্রয়োজন হয়ে পড়ে শনিবার সাপ্তাহিক লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে তা স্পষ্ট হয়ে পড়ল। ছলের সেই সব নমুনা শুনে রাঙা চোখের পুলিশও না হেসে পারল না!
বাইরে কেন, জানেন না লকডাউন?
—বড় বিড়ি খেতে ইচ্ছে হল স্যর, একটাও নেই, তাই ভাবলাম গলির মোড়ে যদি...
এ যদি হয় নিতান্ত আটপৌরে আহ্লাদ, তা হলে বহরমপুর গোরাবাজারের সাইকেল আরোহীকে আটকে পুলিশকে শুনতে হল,
—এমন মেঘ মেঘ দিন স্যর মনটা কেমন করে উঠল। না বেরিয়ে পারলাম না!
নতুন করে সংক্রমণ ছড়াতেই নবান্ন থেকে আপাতত সপ্তাহে দু’দিন বাধ্যতামূলক লকডাউনের অনুশাসন নেমে এসেছে রাজ্য জুড়ে। অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে বেরোলেই পুলিশের ধমক চাই মারও জুটছে। তবু মন যে সে সবের তোয়াক্কা করে না এ দিন বহরমপুরের আনাচকানাচে লকডাউন ভঙ্গকারী বেশ কয়েক জনের কথায় ঠারেঠোরে তা মালুম হয়েছে পুলিশের। যে সব যুক্তি শুনে কখনও ঘেমে নেয়ে একাকার পুলিশ কর্মীরাও ফ্যাক করে হেসে ফেলেছেন। কখনও বা রেগে গিয়ে দু’ঘা বসিয়ে দিয়েছেন। কেউ দিয়েছে শাস্তি কেই বা গাড়িতে তুলে সটান থানায় পাঠিয়েছেন।
ইন্দ্রপ্রস্থের রাস্তায় বাইরে বেরিয়েই পুলিশের মুখে পড়ে গিয়েছিলেন যে যুবক, ফেসগার্ড খুলে এক মুখ হাসি নিয়ে তিনি উর্দিধারীদের জানিয়ে ছিলেন, ‘‘এমনি বেরিয়ে ছিলাম স্যর কেমন লকডাউন হচ্ছে, সবাই তা মানছে কিনা দেখার লোভ সামলাতে পারিনি। তবে আপনারা বললে এখনই ঘরে ঢুকে যাব।’’
মোহনের মোড়ে যে ছেলেটির সাইকেল থামিয়েছিলেন পুলিশ কর্তা তাঁকে শুনতে হয়েছিল, ‘‘সত্যি স্যর, কাছে একটাও বিড়ি নেই। আর ওটি না খেয়ে আমি থাকতে পারি না। কাল কিনতে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ তাই মরিয়ে হয়েই বেরিয়েছি।’’ এক যুবক রাস্তায় বেরিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে হাঁটছিলেন, পুলিশ দেখে নিজেই এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কী ব্যাপার স্যর, আজ কোনও ধর্মঘট-টট হচ্ছে নাকি!’’
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অনীশ সরকার বলেন, “বেশিরভাগ মানুষই অজুহাত হিসেবে হাসপাতাল দেখিয়েছেন। তবে কয়েক জনের কথা শুনে চমকে গেছি, সত্যি রসবোধ বলিহারি!’’ এবং শহরের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় নয় এমন সরস কথা শোনা গিয়েছে, শহরের প্রায় সর্বত্রও। যা শুনে জেলা পুলিশের এক শীর্য কর্তা বলছেন, ‘‘এখানে বদলি হওয়ার পর থেকে তো দিনভর হাতাহাতি আর রেষারেষি সামাল দিয়েই চলেছি, নবাবের শহরে যে এমন আমুদে মানুষের ভিড়, জানতামই না।’’
সেই ভিড়ই সামাল দিয়ে কখনও ছাড় মিলেছে, কখনও ধমক। সারা দিনে লকডাউন তোয়াক্কা না করায় অন্তত ৭০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে এ সব রস-কথার ধার ধারছেন না পুলিশ সুপার কে শবরী রাজকুমার, বলছেন, ‘‘আমরা অত রং-রস বুঝি না, অহেতুক রাস্তায় বেরিয়ে পড়লে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’