জেলায় পেঁয়াজ চাষের মানচিত্রে নওদার স্থান উপরের দিকে। গত বছর ফলন বেশ ভাল হয়েছিল। দামও মিলেছিল বেশ ভাল। সেই লাভের কথা মাথায় রেখে নওদার ১০টি পঞ্চায়েত এলাকার চাষিরা এ বছর একচেটিয়া পেঁয়াজ চাষ করেন। কিন্তু দাম না মেলায় কপালে হাত পড়েছে চাষিদের।
গত বছর প্রতি কুইন্ট্যাল পেঁয়াজ বিকিয়েছে ১৫০০ টাকায়। এ বছর সেই দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। ৭৫০ টাকায় বিকোচ্ছে এক কুইন্ট্যাল পেঁয়াজ। তাতেও আবার পাইকারি ব্যবসায়ীরা ধার-বাকি রাখছে। চাষি হাতে পাচ্ছে ৫০০ টাকা।
পেঁয়াজের দামে এত ভাটা কেন? পড়শি রাষ্ট্র বাংলাদেশে পেঁয়াজের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সেই চাহিদার সিংহভাগই জোগান দেয় মুর্শিদাবাদের নওদা। কিন্তু এ বছর ভোটের মরসুমে সীমান্তে বানিজ্য বন্ধ রয়েছে। ফলে নওদার পেঁয়াজ আর পাড়ি দিতে পারছে না বাংলাদেশে। চাহিদা কম থাকায় স্বভাবতই পেঁয়াজের দাম পড়তির দিকে। এই অনেক চাষিকে কম দামে অভাবী বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা না মেলায় চাষি পেঁয়াজ বেচতেই পারছেন না। ঘরেই পচে যাচ্ছে পেঁয়াজ। চাষিরা ঘরের মেঝেতেই মজুত করছেন পেঁয়াজ। এরফলে দ্রুত পচন ধরছে।
জেলা উদ্যান পালন দফতর জানাচ্ছে, জেলার ২৬টি ব্লকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ চাষ হয় নওদায়। শীতকালীন পেঁয়াজ কাটা হয় চৈত্রে। জমি থেকে তুলে তা ধারাল বঁটি দিয়ে মহিলারা পেঁয়াজকে গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেন। সেই পেঁয়াজ প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি হয়ে চলে যায় বাংলাদেশ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু ভোটের মুখে অনুপ্রবেশ আটকাতে সীমান্ত ‘সিল’ করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ হয়ে গিয়েছে এ পার বাংলার সঙ্গে ওপার বাংলার বানিজ্য। তারই জেরে পেঁয়াজের বাজারে মন্দা। কৃষকদের কথায়, প্রতি বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে প্রায় ১৪ হাজার টাকা খরচ হয়। আর তার সঙ্গে পরিশ্রম তো আছেই। কিন্তু এই মন্দার বাজারে পেঁয়াজ বেচে খরচই উঠছে না। এক কৃষকের কথায়, ‘‘এক বিঘের জমির উৎপন্ন পেঁয়াজ বেচে মেরেকেটে ১২,০০০ টাকা মিলছে। সারা বছর পরিশ্রম করে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠছে না।’’ এ দিকে পেঁয়াজ বেশিদিন ঘরে ফেলে রাখা যায় না। পাছে পচন ধরে। আবার নাসিকের মতো এখানে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য সরকারি বা বেসরকারি স্তরে ব্যবস্থাও নেয়। ফলে চাষিরা মাথা কুটে মরছেন।
নওদার কেদারচাঁদপুরের কৃষক নারায়ণ মণ্ডল বলেন, ‘‘চার বিঘা জমিতে পেঁয়াজ বেচে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম। এ বারও বিঘে চারেক জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলাম। কিন্তু এ বার তো পেঁয়াজ বিক্রিই করতে পারলাম না। অনেক টাকা লোকসান হয়ে গেল।’’ বালির হাসানুজ্জামান বলেন, ‘‘আমার দু’বিঘা জমির পাশে বিল আছে। ফলে সেচের খবচ সেভাবে লাগে না। তাই গত বার পেঁয়াজ বেচে প্রচুর লাভ করেছিলাম। এ বারও ভেবেছিলাম পেঁয়াজ বেচে ভালই লাভ করব। কিন্তু যা ক্ষতি হল, তাতে গত বারের পুঁজি শেষ। আগামী বছর চাষ করার আগে কয়েকশো বার ভাবতে হবে।’’
জেলা উদ্যান পালন দফতরের জেলার কর্তা গৌতম রায় বলেন, ‘‘নওদায় প্রচুর পেঁয়াজ চাষ হয়। সেগুলো বৈধ ভাবেই বাংলাদেশ-সহ এ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যায়। নির্বাচনের মরসুমে পেঁয়াজ রফতানি কার্যত বন্ধ। তার উপর এ বছর দেশের অন্যান্য প্রান্তেও পেঁয়াজের ফলন ভাল হওয়ায় চাষিরা দাম পাচ্ছেন না।’’