একশো দিনের কাজে গিয়ে গণ্ডগোলে জড়িয়ে পড়েছিল সিভিক ভলান্টিয়ার ছেলে। অভিযোগ, বাড়ি ফেরার পথে কয়েকজন তাঁর উপরে চ়ড়াও হয়। ছেলেকে বাঁচাতে বাড়ি থেকে তড়িঘড়ি ছুটে এসেছিলেন কামাল শেখ (৫৫) ও তাঁর পরিবারের লোকজন। অভিযোগ, গ্রামেরই কয়েকজন বাঁশ দিয়ে তাঁদের বেধড়ক মারধর করে। চাপড়া গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মারা যান কামাল। তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে এ দিন রাতে চিকিৎসার পরে বাড়ি ফিরেছেন।
শুক্রবার সকালে নদিয়ার চাপড়ার ওই ঘটনার পরে পুলিশ একটি অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা দায়ের করেছে। জেলা পুলিশের ডিএসপি (সদর) অভিষেক মজুমদার বলেন, ‘‘একশো দিনের কাজ নিয়ে গণ্ডগোল। তারই জেরে খুন হয়েছেন ওই ব্যক্তি। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তরা পলাতক।’’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন সকালে চাপড়ার হাতিশালা ২ গ্রাম পঞ্চায়েতের হাঁটরা গ্রামে একশো দিনের প্রকল্পে জলঙ্গি নদীর বাঁধ সংস্কারের কাজ চলছিল। সেখানে কাজ করছিলেন কামালের ছেলে রফিক শেখ ও তাঁর খুড়তুতো দাদা কোরশেদ শেখ। কোরশেদ আবার ওই প্রকল্পের সুপারভাইজার। অভিযোগ, সেই সময় এলাকারই সাগর শেখ-সহ কয়েকজন কাজ না পেয়ে ঘটনাস্থলে এসে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁরা জানতে চান, কেন তাঁদের নাম মাস্টার রোলে নেই ও কেন তাঁরা কাজ পাবেন না। সেই সময় কোরশেদের পক্ষ নিয়ে সাগরদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন চাপড়া থানার সিভিক ভলান্টিয়ার রফিক।
কোরসেদের কথায়, ‘‘সাগর শেখরা কাজের জন্য ফর্ম পূরণ করে আবেদন করেনি। সেই কারণেই তাঁদের নাম মাস্টার রোলে ছিল না। কাজও পায়নি। কিন্তু রফিকের নাম থাকায় সে কাজ করছিল। প্রথমে একটি গণ্ডগোল হয়েছিল। পরে তা মিটেও যায়। কিন্তু সেটা যে খুনোখুনির পর্যায়ে পৌঁছে যাবে তা ভাবতে পারিনি।’’ রফিক বলছেন, ‘‘ওদের রাগ তো আমার উপরে। আমাকেই মারতে পারত। নিরীহ লোকটাকে পিটিয়ে মারতে ওদের হাত কাঁপল না!’’
স্থানীয় সূত্রে খবর, কাজের ফাঁকে সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ বাড়িতে খেতে যাচ্ছিলেন রফিক। অভিযোগ, বাড়ি পৌঁছনোর আগে তাঁকে সাগর-সহ বেশ কয়েকজন মারধর করে। খবর পেয়ে ছুটে আসেন রফিকের পরিবারের লোকজন। তখনই বাঁশের আঘাতে গুরুতর জখম হন কামাল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তিনি মারা যান। ঘটনার পরে সাগর-সহ মোট চার জনের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু করেছে পুলিশ। ঘটনার পরে হাতিশালা ২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান তৃণমূলের কালীপদ হালদারের দাবি, ‘‘এই খুনের ঘটনার সঙ্গে একশো দিনের কাজের কোনও সম্পর্ক নেই। এটা আসলে দুই পরিবারের ব্যক্তিগত বিবাদের ফল। আমাদের পঞ্চায়েতে একশো দিনের কাজ নিয়ে কোন বেনিয়ম হয় না।’’
তবে গ্রামবাসীদের একাংশ কিন্তু অন্য কথা বলছেন। তাঁদের অভিযোগ, সাগরদেরও যথেষ্ট ক্ষোভের কারণ রয়েছে। কারণ একশো দিনের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপোষণের অভিযোগ এই গ্রামে নতুন কিছু নয়। তাছাড়া নিজে সিভিক ভলান্টিয়ার বলে রফিকও একশো দিনের কাজের ব্যাপারে গ্রামে যথেষ্ট মাতব্বরিও করেন। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলছেন, ‘‘একই বাড়িতে সিভিক ভলান্টিয়ার এক ভাই একশো দিনের কাজ করছেন। আর তাঁর খুড়তুতো আর এক ভাই সেই প্রকল্পেরই সুপারভাইজার। অন্য দিকে, জবকার্ড থাকার পরেও কিছু লোক কাজই পাচ্ছেন না। এটাই বা কী করে হয়?’’
ঘটনার পরে আর একটি বিষয়ও উঠে আসছে। মাসকয়েক আগে হাতিশালা ২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান কালীপদ হালদার-সহ ছ’জন সিপিএম থেকে তৃণমূলে যোগ দেন। তারপরে পঞ্চায়েতও তৃণমূলের দখলে চলে আসে। কামাল ও তাঁর দুই ছেলে প্রথম থেকেই তৃণমূলে ছিলেন। অভিযুক্ত সাগর ও তাঁর আত্মীয়েরা সদ্য সিপিএম থেকে তৃণমূলে এসেছেন। তা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে একটা চাপা অশান্তিও ছিল। জেলা পুলিশের একাংশের অনুমান, সেই রাগও এ দিনের ঘটনায় অনুঘটকের মতো কাজ করেছে।
চাপড়া পঞ্চায়েত সমিতির তৃণমূল সদস্য ফজলুর রহমান মণ্ডল সেই দাবি উড়িয়ে বলছেন, ‘‘দু’পক্ষই তৃণমূলের। দলে কোনও বিভাজন নেই। আর এই ঘটনার সঙ্গে রাজনীতিরও কোন সম্পর্ক নেই।’’ কৃষ্ণনগরের মহকুমাশাসক (সদর) মৈত্রেয়ী গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘খুনের ঘটনার সঙ্গে একশো দিনের কাজের কোনও যোগ আছে কি না তা তদন্ত করে দেখা হবে। কাজে কোনও অনিয়ম ধরা পড়লে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’’