E-Paper

‘ভাতা কি সব’, অনেকের মনেই জাগছে প্রশ্ন

অজয়ের পাড়ে গেলে দেখা যাবে, ঝাঁকে ঝাঁকে ডানা মেলে ঘরে ফিরছে পাখিরা। তৃণমূলও ভাতার ডানায় ভর করে ভোট-বৈতরণী পার হতে চাইছে।

সৌমেন দত্ত

শেষ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১৪
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

জমি গিলে খেয়েছে দামোদর। বাড়ি, দোকানও নদের গর্ভে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়। বর্ধমান শহরের লাগোয়া খণ্ডঘোষের চরমানা গ্রামে ভাঙন-সমস্যা জটিল হচ্ছে রোজ। মাছ ধরতে দামোদরে জাল ফেলে শঙ্কর রায় বলছিলেন, “মাছ ধরে পেট ভরে না। ভাতা পেয়ে উন্নতি হয় না। জমি চলে গিয়েছে দামোদরে। হাতে কাজ চাই।”

অজয়ের তীরে মঙ্গলকোটের ধান্যরুখীর গোপাল দে মুদির দোকান চালান। তাঁর কথায়, “ভাতায় হয়তো কিছু সুরাহা হচ্ছে। কিন্তু চাকরির ব্যবস্থা নেই। বেকার ছেলেরা বাধ্য হয়ে দোকান খুলছে। সবারই আয় কমছে। ধান, আলুরও দাম নেই।” জামালপুরের জৌগ্রাম, আবুঝহাটি, বেরু, যুথিহাটি, তেলে, নুড়ির মতো গ্রামের বহু বাসিন্দা পরিযায়ী শ্রমিক। সুরাতে গয়নার কাজ সেরে বিপ্রতীম চট্টোপাধ্যায় দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে অস্থায়ী দোকান খুলেছেন। তাঁর কথায়, “শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের দেখা যায়। ভাতা ওদের মতোই। স্থায়ী বা বিকল্প আয় নয়।” বৈশাখের প্রথম সপ্তাহেও বিকেলে দামোদর-অজয়ের পাড়ে গেলে দেখা যাবে, ঝাঁকে ঝাঁকে ডানা মেলে ঘরে ফিরছে পাখিরা। তৃণমূলও ভাতার ডানায় ভর করে ভোট-বৈতরণী পার হতে চাইছে।

জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান, মঙ্গলকোটের প্রার্থী অপূর্ব চৌধুরী, এ বার প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া জেলা যুব তৃণমূল সভাপতি রাসবিহারী হালদার, তৃণমূলের মন্দিরা দলুইয়ের দাবি, “লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, যুবসাথী—জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ১০৫টি প্রকল্প থেকে মানুষ সরাসরি সাহায্য পাচ্ছেন। তার সঙ্গে উন্নয়ন।” সঙ্গে জুড়েছেন, “চাকরি দিলে দিদিই (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) দেবেন, বাকিদের মুখে শুধুই আশ্বাস আর ভাঁওতা।” মেমারির সাতগেছিয়ার আবু বক্কর, শক্তিগড়ের দীপক রায়দের দাবি, “হিসাব করলে দেখা যাবে প্রতিটি বাড়িতে গড়ে ছ’হাজার টাকা ভাতা মিলছে। নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের কাছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা তৃণমূলকেই ভোট দেবেন।” গলসির পুরন্দরগড়ের সাজাহান শেখ বলেন, ‘‘গ্রামের মানুষ লক্ষ্মীর ভান্ডার, বার্ধক্য ভাতা পাচ্ছেন। যুব সাথীও পাওয়া শুরু হয়েছে। সব সুরাহা তো এক সঙ্গে হয় না।’’

ভাতার, আউশগ্রাম, গলসি, মেমারি, মন্তেশ্বরের মতো ‘পরিযায়ী’ এলাকার বাসিন্দাদের গলায় অন্য সুর। তাঁদের দাবি, এলাকায় কাজ নেই। তরুণ, যুবকেরা পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে ভিন্‌ রাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। ট্রাইবুনালের লাইনে দাঁড়িয়ে মন্তেশ্বরের হাসিবুল শেখ, গলসির হামিদুল মণ্ডল কিংবা আউশগ্রামের বিমান বিশ্বাসদের কথায়, “পরিবারকে ফেলে কার আর বাইরে থাকতে ইচ্ছা করে। ভাতা দিয়ে তো আর সংসার চলবে না।” কেউ কেরলে রাজমিস্ত্রির কাজ করছেন, কেউ তামিলনাড়ুতে নির্মাণকাজে যুক্ত, কেউ মহারাষ্ট্রে গয়না শিল্পে কাজ করেন। প্রত্যেকেই মাটির বাড়ি ভেঙে পাকা বাড়ি বানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, “ভাতার উপর নির্ভর করে তো আর মাটি ছেড়ে ডাঙায় (পাকা) উঠতে পারতাম না।”

সিপিএমের জেলানেতা, কৃষকসভার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বিনোদ ঘোষ বলেন, “চাষের এলাকা পূর্ব বর্ধমান। তিনটি বড় নদী রয়েছে। সরকারের ভাতা পাওয়ার পরেও পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষ কাজ চান, ভাতা নয়।” বিজেপির বর্ধমান বিভাগের নেতা সুনীল গুপ্ত বলেন, “কর্মসংস্থান নেই বলেই এই জেলার মানুষও তৃণমূলের সঙ্গ ছাড়তে চাইছেন।”

(তথ্য সহায়তা: জয়দীপ চক্রবর্তী)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy