Advertisement
E-Paper

কাঁদলেই বৌমার শাসানি, ছেলের কাছে পাঠাবো

দীর্ঘ বাইশ মাস ধরে চুপ করেই ছিলেন তিনি। খুন হওয়া ছেলের রক্তে ভাসা চেহারাটা মনে পড়লে উঁকি দিত কয়েকটা উত্তর না-মেলা প্রশ্নও। তবে, তা নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলা, এমনকী একটু ‘মন খুলে’ যে কাঁদবেন, সে উপায়ও ছিল না। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেই, আর পাঁচটা কাজের মতো নিয়ম করেই তাঁকে ঠান্ডা গলায় শাসিয়ে যেতেন পুত্রবধূ“কী, ছেলে-খুন হওয়া নিয়ে কাউকে কিছু বলোনি তো, বললে না...ছেলের কাছেই পাঠিয়ে দেব তোমায়!” সোমবার নবদ্বীপের আদালত থেকে বেরিয়ে বিরাশি বছরের ছবি নন্দী এমনই জানিয়েছেন।

দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০২:৪৭
সোমবার নবদ্বীপের আদালত থেকে বাড়ির পথে নিহত অরুণ নন্দীর মা ছবিদেবী।

সোমবার নবদ্বীপের আদালত থেকে বাড়ির পথে নিহত অরুণ নন্দীর মা ছবিদেবী।

দীর্ঘ বাইশ মাস ধরে চুপ করেই ছিলেন তিনি।

খুন হওয়া ছেলের রক্তে ভাসা চেহারাটা মনে পড়লে উঁকি দিত কয়েকটা উত্তর না-মেলা প্রশ্নও। তবে, তা নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলা, এমনকী একটু ‘মন খুলে’ যে কাঁদবেন, সে উপায়ও ছিল না।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেই, আর পাঁচটা কাজের মতো নিয়ম করেই তাঁকে ঠান্ডা গলায় শাসিয়ে যেতেন পুত্রবধূ“কী, ছেলে-খুন হওয়া নিয়ে কাউকে কিছু বলোনি তো, বললে না...ছেলের কাছেই পাঠিয়ে দেব তোমায়!”

Advertisement

সোমবার নবদ্বীপের আদালত থেকে বেরিয়ে বিরাশি বছরের ছবি নন্দী এমনই জানিয়েছেন। মেয়ে শুক্লা দাসের হাত ধরে আদালত চত্বরেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন বৃদ্ধা। বলেন, “কত কথাই যে বলতে পারিনি এত দিন। আজ অনেক হাল্কা লাগছে।”

২০১৩ সালের ৩১ মার্চ রাতে, নবদ্বীপের সিপিএম নেতা অরুণ নন্দী খুনের পরে এফআইআর করেছিলেন তাঁর স্ত্রী উৎপলা। পুলিশের কাছে শুনিয়েছিলেন ডাকাতির ‘গল্প’। এমনকী, পুলিশি জেরায় বার বার ডাকা নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে মহিলা কমিশনে যাওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন পেশায় নার্স ওই মহিলা। অবশ্য শেষরক্ষা হয়নি। শুক্রবার তাঁর ‘প্রেমিক’ নবকুমার দত্ত ধরা পড়ার পরে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল নিহত নেতার স্ত্রী উৎপলা নন্দীকেই।

এ দিন সেই মামলায় আদালতে গোপন জবানবন্দি দিয়েছেন অরুণবাবুর মা ছবিদেবী। পরে বেরিয়ে এসে তিনি বলেন, “আমার অরুণকে খুন করেছে ওর বউ এবং নব। ওদের চরম শাস্তি চাই।” তিনি জানান, এত দিন ভয়ে কোনও কথাই বলতে পারেননি তিনি। বৃদ্ধা বলছেন, “বৌমা বলত ‘কাউকে কিচ্ছু বলবে না।’ কাঁদতে দেখলেই শাসাত, ‘আবার শুরু করলে!’’ তিনি জানান, প্রায় প্রতি রাতেই হুমকিটা এ ভাবেই শেষ করত তাঁর ‘বৌমা’‘কথাটা যেন মনে থাকে।’ সোমবার নবদ্বীপের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ঠিক কী ঘটেছিল সেই দিন এবং তার পরবর্তী প্রায় দু’বছর কী ভাবে কেটেছে তাঁর তা সবিস্তারে বিচারককে জানিয়েছেন ওই বৃদ্ধা।

তাঁর দাবি, এই বাইশ মাস ধরে, ভাল করে ‘খেতে-পরতে’ও দিত না তাঁর পুত্রবধূ। তিনি বলেন, “বড় মেয়ে কাছেই থাকে। ও যদি খেতে না দিত এত দিনে মরেই যেতাম।”

এ দিন সেই বড় মেয়ে শুক্লার সঙ্গে নবদ্বীপ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে এসেছিলেন তিনি। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা পর, বিকেল চারটে নাগাদ বিচারকের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তিনি জানান, সে দিন রাত সাড়ে আটটা নাগাদ তিনি এবং বৌমা ঘরে বসে টিভি দেখছিলেন। হঠাৎই ‘ম্যাডাম ম্যাডাম’ বলে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢোকে নব। ছবিদেবী বলেন, “নবকে কোনও দিনই আমার পছন্দ ছিল না। আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাই।” তাঁর দাবি, এর পর ‘বৌমা’ নবকে ফ্রিজ থেকে বের করে দেয় রান্না করা মাংস। একটু পরে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিলেন তিনি।


ধৃত উৎপলা।

রাতে ফিরে অরুণবাবু মা-কে নিয়ে নীচে খেতে নেমেছিলেন। সে কথা মনে আছে তাঁর। তিনি বলেন, “সে দিন ছেলেই দুধ গরম করে দিয়েছিল। দুধভাত খেয়ে উপরে উঠে গিয়েছিলাম। এর কতক্ষণ পরে মনে নেই, বাইরে কথা কাটাকাটির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। বেরিয়ে এসে দেখি বারান্দায় অরুণের সঙ্গে নব এবং বৌমার তুমুল ঝগড়া হচ্ছে।” তিনি জানান ছেলে তাঁকে শুতে যেতে বলে। আর বৌমা? ছবিদেবী বলেন, “ও তো চিৎকার করে বলছিল, ‘তোমার এখানে দাঁড়িয়ে থাকার কী হল!”

তিনি জানান, অনেক রাতে তাঁর পুত্রবধূ এসে কেঁদে তাঁকে জানায়, রাতে ডাকাত পড়েছিল বাড়িতে। ধড়মড় করে উঠে ছেলের ঘরে গিয়ে তিনি দেখেন, রক্তাক্ত অরুণবাবু খাটে পড়ে। তিনি বলেন, “মায়ের মন বুঝে ছিল এটা গল্প, বৌমা ও নবই ছেলেকে খুন করেছে।” পুলিশের মতো এ দিন তিনিও দাবি করেন, “উৎপলার সঙ্গে নবর ‘সম্পর্ক’ অনেক দিনের। সে দিন রাতে কান্নাকাটির সময় বলে ফেলি অরুণকে তোমরাই খুন করেছ। শুনেই বউমা শাসিয়ে ছিল, চুপ, বাজে কথা বলবে না।” তার পর থেকে চলছিল সেই শাসানি। এত দিনে সে নীরবতাই ভাঙলেন তিনি।

—নিজস্ব চিত্র

debasish bandyopadhyay arun nandy murder utpala nandy
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy