অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে একদা সুবে বাংলার রাজধানী লালবাগে। সৌজন্যে, প্রকৃতিতীর্থ এবং হাজারদুয়ারির যুগলবন্দি।
গত বছরের ১৫ জুলাই, পর্যটকদের জন্য প্রকৃতিতীর্থের দরজা খোলার মাস ছ’য়েকের মধ্যে পর্যটকের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে। গত রবিবারই টিকিট কেটে প্রকৃতিতীর্থে এসেছেন সাড়ে ন’হাজার পর্যটক। এত দিন আম পর্যটকের গন্তব্য ছিল হাজারদুয়ারি। ইদানীং তাতে ভাগ বসিয়েছে মোতিঝিলে গড়ে ওঠা ‘প্রকৃতিতীর্থ’। এই দু’টি ঐতিহাসিক পুরাসম্পদ পর্যটন শিল্পের নিরিখে পরস্পরের যেমন প্রতিদ্বন্দ্বী, তেমন পরিপূরকও।
পর্যটক সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রকৃতিতীর্থ ঘিরে গড়ে উঠছে নিত্যনতুন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। ‘মুর্শিদাবাদ হেরিটেজ ডেভলপমেন্ট সোসাইটি’র সম্পাদক সন্দীপ নলাক্ষা বলেন, ‘‘দু’বছরে লালবাগ ও লাগোয়া বহরমপুরের হোটেলে বড়তি ১২০০ ঘর তৈরি হয়েছে।’’ পর্যটন শিল্পের সুবাদে এ রকম বৃদ্ধির নজিরে খুশি সব মহল। স্থানীয় অর্থনীতির শক্ত ভিতের উপরে দাঁড়াবে বলে আশাবাদী মুর্শিদাবাদ জেলাশাসক ইয়েচুরি রত্মাকর রাও নিজেও। পর্যটকদের জন্যে সুখবরও শুনিয়েছেন তিনি। ‘‘আগামী ২৬ জানুয়ারি প্রকৃতিতীর্থে চালু হতে চলেছে আলো ও শব্দে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস ফিরে দেখার প্রকল্প’’— বলছেন জেলাশাসক।
এত দিন পর্যটকরা মোতিঝিল লাগোয়া চারটি বেসরকারি পার্কে পিকনিক করতেন। প্রকৃতিতীর্থ চালু হওয়ায় ওই চারটি পার্কের পক্ষে পিকনিকের ভি়ড় সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এ কথা জানিয়ে জেলা চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক তথা সিটি মুর্শিদাবাদ (লালবাগ) ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘প্রকৃতিতীর্থ লাগোয়া অনেক গুলি আমবাগান রয়েছে। এ বছর ওই সব বাগান মালিকদের কাছ থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য জায়গা ভাড়া নিয়ে পিকনিক করছেন অনেকেই। উপরি আয় হচ্ছে বাগান মালিকদের।’’ পিকনিকের সুবাদে সব্জি, আনাজ, চাল, ডাল, মাংসের সরবরাহ বাড়ায় এলাকার কৃষি থেকে ব্যবসা সবটাই চাঙ্গা হয়েছে।
প্রকৃতিতীর্থকে কেন্দ্র করে সদ্য গড়ে উঠেছে উন্নতমানের ছ’টি রেস্টুরেন্ট ও দু’টি হোটেল। মোটর বাইক ও চার চাকার গাড়ি রাখার জন্য প্রকৃতিতীর্থের ভিতরে রয়েছে সরকারি গ্যারাজ। বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু গ্যারাজ। সেখানেও বহু বেকারের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রকৃতিতীর্থের কারণে ওই তল্লাটে বছর খানেকে জমির দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
আলোর ফোয়ারায় সেজেছে মোতিঝিল।—নিজস্ব চিত্র।
বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় এত দিন পর্যটকেরা লালবাগে রাত না কাটিয়ে দিনের আলো থাকতে ফিরে যেতেন। ‘মুর্শিদাবাদ নগর উন্নয়ন কমিটি’র সম্পাদক আব্দুর রউফ খান জানাচ্ছেন, মোতিঝিল বিনোদনের অভাব অনেকটাই পূরণ করেছে। লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের মাধ্যমে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস তুলে ধরার প্রকল্প, ঝিলের বুকে বোটিং (প্রস্তাবিত) বাকি অভাব পূরণ করবে।
বৃদ্ধির গতিকে আরও বাড়াতে ‘মুর্শিদাবাদ পর্যটন সহাযতা কেন্দ্র’-এর একটি প্রস্তাব রয়েছে। নবাব সিরাজের মাসি ঘসেটি বেগমের বিলুপ্ত প্রাসাদস্থল মোতিঝিল। এর এক কিলোমিটার দূরে নদীর পশ্চিম পাড়ে খোসবাগে রয়েছে সপরিবার নবাব সিরাজ ও নবাব আলিবর্দির সমাধিক্ষেত্র। নদী পার হয়ে ঘুর পথে মোতিঝিল থেকে খোসবাগের পৌঁছতে পাড়ি দিতে হয় তিন কিলোমিটারেও বেশি পথ।
‘মুর্শিদাবাদ পর্যটন সহাযতা কেন্দ্র’- এর সম্পাদক স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘রোপওয়ের মাধ্যমে মোতিঝিলের সঙ্গে খোসবাগের যোগ হলে পথের দূরত্ব কমে হবে মাত্র এক কিলোমিটার।’’ পাশাপাশি রোপওয়ে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াবে। বাড়বে আয়ও। রোপওয়ের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন জেলাশাসক। এ বিষয়ে পদক্ষেপ করবেন বলেও তিনি জানান।