অপহরণ নাকি নির্বাচনকে সামনে রেখে সহানুভূতি আদায়ের নাটক— তর্কটা আপাতত থিতিয়ে এসেছে।
গলায় গামছার প্যাঁচ দিয়ে তিন দিন আগে সেই যে দুষ্কৃতীরা তাঁকে নিয়ে উধাও হয়েছে, তারপর থেকে জল্পনা আর গুজব, মিলেমিশে এক হয়ে গেলেও নির্দল কাউন্সিলর দেবজ্যোতি রায়ের হদিস দিতে পারেননি কেউই। বরং কংগ্রেস এবং তৃণমূল, পরস্পরের দিকে বল ঠেলাঠেলির মাঝে তলবিসভার প্রক্রিয়া মিটিয়ে ফেলেছে তারা।
শুক্রবার, পুলিশের এক কর্তা আওড়ে ফেলেছিলেন, যেখানেই থাকুন না কেন ওই কাউন্সিলর ভাল আছেন বলেই মনে হচ্ছে। চেপে ধরতে সময় নেয়নি কংগ্রেস, কী করে বলছে পুলিশ? তার মানে কী প্রমাণ হচ্ছে না, এটা শাসক দল এবং পুলিশের জ্ঞাতসারেই হয়েছে?
শনিবার অবশ্য সেই মন্তব্য থেকে এক ধাপ পিছিয়ে এসে পুলিশ তদন্তের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা তিন দিন আগেই করা যেত বলে মনে করছেন মুর্শিদাবাদ জেলার প্রাক্তন এক পুলিশ সুপার।
দেবজ্যোতির স্কুলে গিয়ে, প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে বর্ননা শুনে এ দিন অভিযুক্তদের অন্তত দু’জনের ছবি আঁকিয়েছে পুলিশ। জেলা পুলিশের এক কর্তা বলছেন, ‘‘ছবি দেখে দু’একটা চেনা মুখ ভেসেও উঠছে।’’
কান্দির এসডিপিও ইন্দ্রজিৎ সরকার এ দিন বলেন, ‘‘যতদূর জানা যাচ্ছে, ওই শিক্ষকের মোবাইলটি ওই দিন বড়ঞা এলাকাতেও চালু ছিল। তারপর থেকেই ওটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।’’ সেই সূত্র ধরেও এগোনোর চেষ্টা চলছে বলে জানাচ্ছেন তিনি।
ছবি আঁকাল কান্দি পুলিশ
জেলা পুলিশের এক কর্তা বলছেন, ‘‘কাজটা যারাই করুক না কেন, দিনের বেলায় প্রকাশ্যে অপহরণ তো, অন্তত দিন সাতেক ধরে নাকা না করে ওই কাজে কেউ হাত দেবে না।’’ এমনকী যে পথে দেবজ্যোতিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, জেলার সেই সব পথঘাটও আগাম নাকা করেছিল দুষ্কৃতীরা বলেই মনে করছে পুলিশ।
পুলিশের অনুমান, বড়ঞা এলাকা দিয়েই নিয়ে যাওয়া হয়েছে দেবজ্যোতিকে। সেই সময়ে বাদশাহী সড়ক ধরে কিছুদূর যাওয়ার পরে ওই কাউন্সিলরের মোবাইলটি বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে অনুমান। ফলে টাওয়ার লোকেশনের সূত্র ধরে তাঁর খোঁজ করার চেষ্টা ওখানেই থমকে গিয়েছে।
তবে ওই রাস্তা দিয়ে বীরভূম যাওয়া যায়। সেখান থেকে ঝারখন্ডের দিকে নিয়ে যাওয়াও হতে পারে তাঁকে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
দেবজ্যোতি সুগারের রোগী। জেলা ও পড়শি জেলাগুলিতেও সাদা পোষাকের পুলিশ খোঁজ নিয়ে দেখছে সন্দেহজনক কোনও ক্রেতা সুগারের ওষুধ কিনছে কিনা। নজরদারি বাড়ানো হয়েছে হোটেলগুলিতেও।
ঘটনার পরে দেবজ্যোতিবাবুর স্কুলের প্রধানশিক্ষক লোহারাম মিশ্র এবং স্ত্রী সান্ত্বনা থানায় অভিযোগ করার পরে আরও এক জন অপহরণের অভিযোগ জানিয়ে গিয়েছে বলে এ দিন জানা গিয়েছে। তিনি কে? থানার জবাব: উত্তম ঘোষ।
উত্তম ঘোষ কে, কেনই বা তাঁর অভিযোগ ফের নেওয়া হল— তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কান্দির বিদায়ী পুরপ্রধান অপূর্ব সরকার। তিনি বলেন, “আমরা ঘটনার দিন রাত পর্যন্ত থানাতে ছিলাম। উত্তম ঘোষ নামে কেউ এসে অভিযোগ করল, আর আমরা জানতেই পারলাম না, এটা হতে পারে?’’
কংগ্রেসেরে দাবি, ওই উত্তম ঘোষের পরিচয় স্পষ্ট করুক পুলিশ। তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে জিঞ্জাসাবাদ করা হোক।
এ দিন অপহৃত কাউন্সিলরের সান্ত্বনা রায় জোর গলায় বলেছেন, “পুলিশের মদতে আমার স্বামীকে তৃণমূল অপহরণ করেছে। পুলিশ সব জানে। না হলে জেলার পুলিশ সুপার আমাকে বলেন কী করে, ‘আপনার স্বামীকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে।’’
এ দিন সকাল থেকে তাঁদের বাড়িতে প্রতিবেশী ও অনুগামীদের ভিড়। জামাই অপহরণের খবর পেয়ে দূর্গাপুর থেকে কান্দিতে এসেছেন সান্ত্বনার বাবা উমাপদ সামন্ত। তিনি বলেন, “যারা এমন কাজ করেছে তাদের কাছে আমার আবেদন আমার জামাইকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে দাও।’’
এ দিন দফায় দফায় পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে দরবার করেছেন জেলা কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের নেতারা। সিপিএম সম্পাদক মৃগাঙ্ক ভট্টাচার্য ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নৃপেন চৌধুরী নিজে এসে কান্দি তানায় স্মারকলিপি জমা দেন।
তবে সদ্য দলত্যাগী কাউন্সিলর তৃণমূলের গৌতম রায় এ দিনও বলছেন, “দেবজ্যোতি আমাদের বিরোধী শিরিরে থাকলেও সে আমাদের কান্দির মানুষ। এমন ঘটনা ঘটুক সেটা আমরাও চাই না। তবে ওই অপহরণের সাথে তৃণমূলের কোন যোগ নেই।’’