অনুদানের টাকায় স্কুলের গবেষণাগারের সরঞ্জাম কেনা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠল কৃষ্ণগঞ্জের বিডিও-র বিরুদ্ধে। ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে সীমান্ত এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পে (বর্ডার এরিয়া ডেভলপমেন্ট প্রোগ্রাম) নদিয়া জেলায় বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন সাতটি ব্লকের ৩৩টি স্কুলে বিজ্ঞান গবেষণাগারের সরঞ্জাম কেনা ও পরিকাঠামো তৈরির জন্য স্কুল পিছু দশ লক্ষ টাকা অনুমোদন করে জেলা প্রশাসন। স্কুলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তালিকা তুলে দেওয়া হয় বিডিও-র হাতে। কিন্তু টেন্ডার ডেকে বাজার দরের তুলনায় প্রায় তিন-চার গুণ বেশি টাকা দিয়ে গবেষণার সরঞ্জাম কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ। এর ফলে নির্ধারিত টাকায় যে পরিমাণ সামগ্রী পাওয়ার কথা ছিল তার থেকে অনেক কম মেলায় সরঞ্জাম নিতে অস্বীকার করে কৃষ্ণগঞ্জ মাজদিয়া রেলবাজার হাইস্কুল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক রতন মণ্ডল বলেন “আমরা বাজার ঘুরে ও ইন্টারনেটে বিভিন্ন কোম্পানির নির্দিষ্ট মডেল চিহ্নিত করে বিক্রয়মূল্য-সহ তালিকা দিয়েছিলাম বিডিও-কে। পরে দেখা গেল একই কোম্পানির একই মডেলের বেশি দাম দেখানো হচ্ছে। কোনও-কোনওটা তিন থেকে চার গুণ দামে কেনা হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। এটা একেবারেই সমর্থন করা যায় না। তাই ফিরিয়ে দিয়েছি।’’
বিএডিপি প্রকল্পে কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের তিনটি স্কুল অনুমোদন পেয়েছিল। রেলবাজার হাইস্কুল ছাড়াও তালিকায় রয়েছে স্বর্ণখালি পাইকপাড়া বিবেকানন্দ হাইস্কুল ও চন্দননগর রাধা দামোদর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। ওই দুই স্কুল কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছেন দামে কারচুপি লক্ষ করেছেন তাঁরাও। কিন্তু বাধ্য হয়েই গ্রহণ করেছেন ওই সরঞ্জাম। স্বর্ণখালি স্কুলের প্রধান শিক্ষক সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “টেন্ডার প্রক্রিয়া মিটে যাওয়ার পরে দেখি প্রতিটি জিনিসেরই দাম বাজার দরের থেকে অনেক বেশি। ফলে বিডিও-র কথা মতো বেশ কিছু উপকরণ তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিই। গবেষণাগারের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করতে পারছিলাম না। তাই বাধ্য হয়েই অনিয়ম সত্ত্বেও ওই সরঞ্জাম গ্রহণ করেছি।’’
প্রায় একই কথা বলেছেন চন্দননগরের স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সমীর দা।ঁ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের অন্ধকারে রেখে টেন্ডার ডাকা হয়েছিল। অনেক উপকরণই নিম্ন মানের। বাজার দরের থেকে অনেক বেশি দাম দেখানো হয়েছে। প্রথম দিন তাই ওই সব সরঞ্জাম ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। পরে ছাত্রদের কথা ভেবে বিডিও-র কথায় রাজি হয়ে গিয়েছি।’’
রাজি হতে পারেনি শুধু মাজদিয়া রেলবাজার হাইস্কুল। সম্প্রতি ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক গোটা ঘটনাটি লিখিত ভাবে জেলাশাসককে জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা চিঠি নিয়ে তিনি নবান্নতে গিয়ে জমা দিয়েও এসেছেন। রতনবাবু বলেন, ‘‘বিডিও একদিন আমাদের ডেকে বলেন আমরা যে উপকরণ চাইছি তার দাম অনেক বেশি পড়ে যাচ্ছে। প্রায় ১৯ লক্ষ ১৮ হাজার ৮৬৬ টাকা হিসেব দেন। আমাদের কিছু সরঞ্জাম কমিয়ে দিতেও পরামর্শ দেন। কিন্তু আমাদের হিসাব অনুযাযী ওই সরঞ্জামের দাম দশ লক্ষ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। তালিকা মেলাতে গিয়েই আমরা রীতিমতো অবাক হয়ে যাই। দেখি প্রতিটি উপকরণের দাম অস্বাভাবিক বেশি ধরা আছে। তখনই আমরা বিডিও-কে জানিয়ে দিয়েছি যে এত বেশি দাম দিয়ে আমরা সরঞ্জাম নিতে পারব না।’’ প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে একমত স্কুল পরিচালন সমিতির সম্পাদক তৃণমূলের শঙ্কর মিত্র। তিনি বলেন, ‘‘যে ভাবে টেন্ডার ডেকে সরঞ্জাম কেনা হয়েছে তাতে স্বচ্ছতার অভাব আছে। সরকারি নিয়ম না মেনে স্কুল কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে টেন্ডার ডাকা হয়েছিল। বিডিও সবটাই জানেন। তাই বাধ্য হয়ে পরিচালন সমিতির মত নিয়ে ওই সরঞ্জাম প্রত্যাহার করেছি।’’ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শিক্ষক এবং বিজ্ঞানের শিক্ষককে নিয়ে কমিটি করে বিডিও গোটা প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে সব কিছুই ঘটেনি বলে অভিযোগ ওই স্কুল কর্তৃপক্ষের। তাঁদের আরও অভিযোগ স্কুল-কলেজের গবেষণাগারে সরঞ্জাম সরবরাহকারী কলকাতার একটি সংস্থাকে টেন্ডার সংক্রান্ত কাগজপত্র দিতে চাননি বিডিও।
কৃষ্ণগঞ্জের বিডিও অমৃতা বর্মন রায় অবশ্য সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘নিয়ম মেনেই টেন্ডার প্রক্রিয়া পরিচালনা করা হয়েছে। যে সংস্থা সর্বনিম্ন দর দিয়েছে তাকে আমরা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে বলেছি। এর মধ্যে তো আমি কোনও অন্যায় দেখছি না।’’ কিন্তু কেন স্কুল কর্তৃপক্ষকে অন্ধকারে রাখা হল, কেনই বা কলকাতা থেকে আসা সংস্থাকে টেন্ডারে অংশ নিতে দেওয়া হল না? বিডিও-র জবাব, ‘‘এই সব বিষয়ে কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।’’ অতিরিক্ত জেলাশাসক দেবকুমার নন্দন বলেন, ‘‘সীমান্তের ৩৩টি স্কুলের সায়েন্স ল্যাবরেটরির সরঞ্জাম কেনা ও পরিকাঠামো তৈরির জন্য বিএডিপি থেকে দশ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল ওই সব স্কুলের বিজ্ঞান বিভাগের গবেষণাগারের জন্য কি প্রয়োজন সেটা স্কুল ঠিক করবে। সেই মতো বিডিও, প্রধান শিক্ষক ও স্কুলের বিজ্ঞানের শিক্ষককে নিয়ে কমিটি গঠন করে পুরো বিষয়টি পরিচালনা করতে হবে।’’ অভিযোগ পাওয়ার পরই তদন্ত শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। জেলাশাসক পি বি সালিম বলেন, ‘‘কোনও রকম অনিয়ম সহ্য করা হবে না। একটা স্কুল আমাদের কাছে অভিযোগ করেছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’