E-Paper

‘বিবেচনাধীন’ কোন ভিত্তিতে ‘ঘুসপেটিয়া’, জবাব নেই

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সোমবার মথুরাপুরে বলেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে বিনা বাধায় অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকানো হয়েছিল। এখন তাদের নাম কাটা যাচ্ছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের তাড়ানো হবে।’’

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ মার্চ ২০২৬ ০৮:০৫
নিতিন নবীন।

নিতিন নবীন। — ফাইল চিত্র।

নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে ৬৩ লক্ষ নাম বাদ দিয়েছে। তাঁদের কেউ মৃত, কেউ স্থানান্তরিত, কেউ গরহাজির, কারও অন্য জায়গায় নাম রয়েছে। আরও প্রায় ৬০ লক্ষ নাম ‘বিবেচনাধীন’। তাঁদের নথি খতিয়ে দেখছেন এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত বিচারকরা।সেই কাজ শেষের আগেই রবিবার বিজেপির সভাপতি নিতিন নবীন রাজ্যে গিয়ে বলে দিলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে ৫০ লক্ষের বেশি অনুপ্রবেশকারীর নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটা গিয়েছে।’’ সেখানেই না থেমে এ দিনও তিনি উত্তর দিনাজপুরে এসে একই কথা বলেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সোমবার মথুরাপুরে বলেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে বিনা বাধায় অনুপ্রবেশকারীদের ঢোকানো হয়েছিল। এখন তাদের নাম কাটা যাচ্ছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের তাড়ানো হবে।’’

বিরোধীদের প্রশ্ন, বিজেপি সভাপতি কোথা থেকে ৫০ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা পেলেন? যাঁদের নথি খতিয়ে দেখা চলছে, তাঁদের অধিকাংশ মানুষকে কি তিনি আগে ভাগেই ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে দিলেন? ভোটার তালিকা থেকে বহু হিন্দুর নামও বাদ গিয়েছে বা বিচারাধীন রয়েছে। নিতিন নবীন ও অমিত শাহ কি তাঁদেরও অনুপ্রবেশকারী বা ‘ঘুসপেটিয়া’ বলছেন? তৃণমূল-সহ বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন আগেই বিচারাধীন ৬০ লক্ষ মানুষকে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারীর তালিকায় ফেলে দিচ্ছে। অথচ তাঁদের মধ্যে রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী থেকে বিশ্বকাপ জয়ী মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্য রিচা ঘোষের নামও রয়েছে। তৃণমূলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদারের কথায়, ‘‘নির্বাচন কমিশন কোথাও বলেনি যে, বাদ দেওয়া নামের মধ্যে বিদেশি, অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গাদের নাম রয়েছে। বিজেপি সভাপতি শুধু অসত্যই বলেননি, কমিশনের উপর ৫০ লক্ষ অনুপ্রেবশকারীকে চিহ্নিত করার দায় ঠেলে দিয়েছেন। আসলে এই রকম একটা ধারণা তৈরি করে বিজেপি গোড়া থেকে কমিশনকে দিয়ে এ রাজ্যের প্রকৃত ভোটারেরনাম বাদ দিতে চেয়েছে। এখন কমিশনকে বিজেপি সভাপতির দাবির ব্যাখ্যা দিতে হবে।’’

বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেন, “ভোটার তালিকা থেকে আদিবাসী, তফসিলি, মতুয়াদের অনেকের নাম বাদ গিয়েছে। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি ‘বিবেচনাধীনে’র তালিকায় থাকা মানুষকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলেছেন!’’

শনিবার এসআইআর-এর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কত জন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে? আগরওয়াল বলেছিলেন, ‘‘ওটা আমাদের কাজ নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক দেখে, এফআরআরও (বিদেশি আঞ্চলিক পঞ্জিকরণদফতর) দেখে।’’

বিজেপি নেতারা প্রথম থেকেই বলছেন, এসআইআর-এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাংলাদেশি, রোহিঙ্গাদের বাদ দেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশন প্রথম বিহারে এসআইআর করেছিল। সেখানেও বিজেপি একই প্রচার করে। বিহারে ভোটার তালিকা থেকে মোট ৪৭ লক্ষ নাম বাদ যায়। তখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কত জন বিদেশি অনুপ্রবেশকারী পাওয়া গিয়েছে? কোনও উত্তর মেলেনি।

এসআইআর-এর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ভোটার তালিকায় ‘সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিক’ মিললে ইআরও-রা তা নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠাবেন। বিহারের কত জন ‘সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিক’-এর নাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠানো হয়েছে? নির্বাচন কমিশন এ নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ।

সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর নিয়ে মামলায় প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ বলেছিল, এসআইআর-এর নির্দেশিকায় এর কারণ হিসেবে বেআইনি অনুপ্রবেশের কথা বলাই নেই। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেছিলেন, কমিশন কাউকে নাগরিকত্ব দিতে পারে না। শুধুমাত্র ভোটার তালিকা তৈরির জন্য নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে। তা নির্বাচন কমিশনও মেনে নিয়েছিল। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচি বলেছিলেন, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকত্ব চলে যাওয়া নয়।

নির্বাচন কমিশনের কর্তারাও তা মানছেন। তাঁদের বক্তব্য, চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় কারও নাম কাটা গেলেও তিনি জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা ডিইও-র কাছে আপিল করতে পারবেন। তার পরে সিইও-র কাছে আপিলের সুযোগ থাকবে। কোনও নথির অভাব থাকলে, তিনি তা জোগাড় করার চেষ্টা করতে পারেন। তার পরে আবার ভোটার হিসেবে নাম তোলার আবেদন জানাতে পারেন। নির্বাচন কমিশন কাউকে সন্দেহভাজন বিদেশি নাগরিক হিসেবে মনে করলে, তাঁর নাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠাবে। সে ক্ষেত্রে অভিবাসন ও বিদেশি আইনে তাঁর কাছে নোটিস যাবে। বিদেশি ট্রাইব্যুনাল ফয়সালা করবে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যাওয়া যায়।

কমিশন সূত্রের বক্তব্য, এসআইআর-এর সময়ে কোনও বাংলাদেশি নাগরিকের কাছে এ দেশের ভোটার ও আধার কার্ড পাওয়া গেলে, তার তালিকা এফআরআরও কমিশনকে পাঠিয়েছে। সেই সব নাম বাদ গিয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। নির্দিষ্ট সংখ্যা না বললেও কমিশনের বক্তব্য, গত কয়েক মাসে এমন কয়েক হাজার নাম বাদ গিয়েছে। তবে তাঁরা মূলত পাসপোর্ট নিয়ে যাতায়াত করেছেন। অবৈধ ভাবে কেউ ভারতে ঢুকলে, তা এফআরআরও-র পক্ষে বলা মুশকিল। সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। তাই কমিশনও সরাসরি বলতে পারে না, কে বাংলাদেশি বা কে নন।

বিরোধী শিবিরের প্রশ্ন, তা হলে অমিত শাহ থেকে নিতিন নবীন আগে ভাগেই রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ গেলে তাঁদের ‘ঘুসপেটিয়া’ বা অনুপ্রবেশকারী বলে দিচ্ছেন কী ভাবে?

বিরোধী শিবির এখানে বিজেপির অসমের রাজনৈতিক কৌশলের ছায়া দেখছে। প্রদেশ কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসু বলেন, বিজেপি অসমে ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিল, এনআরসি করে অনুপ্রবেশকারীদের তাড়ানো হবে। এনআরসি-র খসড়া তালিকায় ৪০ লক্ষ মানুষের নাম থাকায় অমিত শাহ তাঁদের সবাইকে অসম থেকে তাড়ানোর হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় মাত্র ১৯ লক্ষের নাম ওঠে। বহু হিন্দু অসমিয়ার নামও বাদ পড়ার তালিকায় ঢুকে যায়। বিপাকে পড়ে বিজেপিই এনআরসি-র বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু তার আগে বিজেপি অনুপ্রবেশকারীরধুয়ো তুলে রাজনৈতিক ফায়দাকুড়িয়ে নিয়েছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy