Advertisement
E-Paper

কপিলের প্রয়াণে ভিড় জমল না মতুয়া-গড়েই

হাজারখানেক পুলিশ, র্যাফ, কমব্যাট ফোর্স তৈরি। গোটা ঠাকুরনগর এলাকা কার্যত মুড়ে ফেলা হয়েছে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে। সোমবার বিকেলের পর থেকে এলাকায় একাধিক বার ঘুরে গিয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরী, এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) সিভি মুরলিধরণ। কিন্তু যে বাঁধভাঙা ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য এত সাজ সাজ রব, সেই ভিড়টাই তো জমল না বনগাঁর সাংসদ কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের প্রয়াণকে ঘিরে!

সীমান্ত মৈত্র

শেষ আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০১৪ ০২:৩৮
শেষ শ্রদ্ধা। প্রয়াত সাংসদ কপিলকৃষ্ণের সামনে তৃণমূল নেতা মুকুল রায়। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।

শেষ শ্রদ্ধা। প্রয়াত সাংসদ কপিলকৃষ্ণের সামনে তৃণমূল নেতা মুকুল রায়। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক।

হাজারখানেক পুলিশ, র্যাফ, কমব্যাট ফোর্স তৈরি। গোটা ঠাকুরনগর এলাকা কার্যত মুড়ে ফেলা হয়েছে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে। সোমবার বিকেলের পর থেকে এলাকায় একাধিক বার ঘুরে গিয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার পুলিশ সুপার তন্ময় রায়চৌধুরী, এডিজি (দক্ষিণবঙ্গ) সিভি মুরলিধরণ। কিন্তু যে বাঁধভাঙা ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য এত সাজ সাজ রব, সেই ভিড়টাই তো জমল না বনগাঁর সাংসদ কপিলকৃষ্ণ ঠাকুরের প্রয়াণকে ঘিরে! আজ, বুধবার অবশ্য অন্তিমযাত্রায় বহু মানুষের ঢল নামবে বলে ঠাকুরবাড়ির একটি সূত্রের দাবি।

কপিলকৃষ্ণের পরিচয় শুধু যে তৃণমূল সাংসদই নয়, ৭৪ বছরের জীবনে সারা ভারত মতুয়া মহাসঙ্ঘের গুরুত্বপূর্ণ পদ সামলেছেন তিনি। মতুয়া মহাসঙ্ঘের প্রধান উপদেষ্টা বীণাপাণিদেবীর (বড়মা) বড় ছেলেও তিনি। তাঁর প্রয়াণে মতুয়া ভক্তদের ভিড়ে উপচে পড়বে এলাকা, এমনই মনে করেছিলেন পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা। কিন্তু কোথায় কী! পুলিশ কর্মীদের অনেককেই মঙ্গলবার সারাটা দিন মতুয়াদের ধর্মীয় পীঠস্থান ঠাকুরনগরের আনাচ-কানাচে ঢিলেঢালা ভাবে বসে-দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। কেউ বিড়ি ফুঁকছেন, কেউ মোবাইলে খোশ গল্প করতে ব্যস্ত।

বস্তুত, মতুয়া বাড়ির সঙ্গে যুক্ত অনেকের চোখেই কপিলের মৃত্যুর পরে এমন ছবি সত্যিই অপ্রত্যাশিত ঠেকছে। প্রবীণেরা বলছেন, ১৯৯২ সালে কপিলবাবুর বাবা, মতুয়াদের ঠাকুরবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা প্রমথরঞ্জন ঠাকুরের মৃত্যুতে ভিড়ের চোটে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা এলাকা। ডঙ্কা-কাঁসি (মতুয়াদের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র), নিশান নিয়ে দলে দলে ভক্ত ভিড় করেছিলেন ঠাকুরনগরে। যে বিশাল মাঠে মতুয়াদের ‘ধর্ম মহামেলা’ হয়, সেখানেই সকলের পাত পেড়ে খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। চোখের জলে ভেসে নিজেদের ধর্মগুরুকে শেষ বিদায় জানিয়েছিলেন অগণিত মতুয়া।

জেলা পুলিশের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই নিরাপত্তার বন্দোবস্ত রাখা হয়। কিন্তু বাস্তবে এ দিনের ছবি প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। সাংসদ কপিলকৃষ্ণের মৃত্যুতে বনগাঁয় লোকসভা উপনির্বাচন যে হেতু অনিবার্য এবং মতুয়া ভোটই যে হেতু শাসক দলের তুরুপের তাস, তাই এ দিনের ছবি কপালে ভাঁজ ফেলছে তৃণমূলেরও।

যদিও মতুয়া ভক্তদের অনেকে মনে করছেন, মতুয়া নিয়ে অতিরিক্ত রাজনীতিই এই নিস্পৃহতার অন্যতম কারণ। ঠাকুরনগর স্টেশনের কাছে এক হোটেল-মালিকের কথায়, “আমাদের মেলায় এর থেকে বেশি ভিড় হয়। আসলে গোটা ব্যাপারটায় কেমন যেন রাজনীতির রঙ লেগে গিয়েছে। সে জন্যই লোকজন কম বলে মনে হচ্ছে।” শেষ শ্রদ্ধা জানাতে আসা কেউ কেউ বলেই গিয়েছেন, “ঠাকুরবাড়িতে এখন বড় রাজনীতি! এ সব ভক্তেরা ভাল চোখে দেখেন না।” ঠাকুরবাড়িতে শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি দক্ষিণ ২৪ পরগনার চারালখালির বাসিন্দা জয়ন্ত বিশ্বাস। ফোনেই বলেছেন, “ধর্মের মধ্যে বড্ড বেশি রাজনীতি ঢুকে গিয়েছে। ঠাকুরবাড়ির লোকজন রাজনৈতিক জগতে এত মেলামেশা কেন করবেন?” আবার কারও কারও মতে, প্রমথরঞ্জনবাবুর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার সঙ্গে তুলনাই চলে না স্বভাব-গম্ভীর কপিলের।

ঠাকুরবাড়ির সামনে পুলিশ কর্তারা। মঙ্গলবার তোলা নিজস্ব চিত্র।

কপিলবাবুর দেহ সোমবার রাত থেকেই শোয়ানো ছিল ঠাকুরবাড়ির নাটমন্দিরের সামনে অস্থায়ী মঞ্চে। সেখানে ফুল-মালা দিতে গেলে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে পরীক্ষা করা হচ্ছে সকলকে। তৃণমূলের জেলা সভাপতি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক সোমবার থেকেই আছেন গাইঘাটায়। দলের সর্বভারতীয় নেতা মুকুল রায় মরদেহ সঙ্গে করে এনেছিলেন কলকাতা থেকে। তিনি এ দিন ফের আসেন। আসেন আরও বহু নেতা-নেত্রী। তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশ আবার ঠাকুরবাড়িতে এসে সারা ক্ষণই ব্যস্ত ছিলেন, উপনির্বাচনে এ পরিবারের কেউ টিকিট পাবেন কি না, সেই চর্চায়!

ঠাকুরবাড়িতে এসেছিলেন গত লোকসভা ভোটে বনগাঁর বিজেপি প্রার্থী কেডি বিশ্বাস। কপিলবাবুর মৃত্যুতে শোক জানিয়েও তাঁর বক্তব্য, “ঠাকুরবাড়ি তো আসলে এখন তৃণমূল-বাড়ি হয়ে গিয়েছে! সে জন্যই ভক্তেরা অনেকে আসতে উৎসাহ পাননি!” তাঁর মতে, কিছু দিন আগে কপিলের ভাই মৃদুলকৃষ্ণ মারা যাওয়ার পরেও ঠাকুরবাড়িতে এর থেকে বেশি ভিড় হয়েছিল। কপিলবাবুর আর এক ভাই, মন্ত্রী মঞ্জুলকৃষ্ণ বা তাঁর ছেলে সুব্রত অবশ্য চার দিক সামলানোর মাঝে ভিড় নিয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। জ্যোতিপ্রিয়বাবু যদিও মনে করছেন, আজ শেষকৃত্যে ভিড় বাড়বে।

সিপিএম নেতা কান্তি বিশ্বাস, লোকসভা ভোটে বনগাঁয় দলের প্রার্থী দেবেশ দাস, অসীম বালা এ দিন দেখা করেছেন বড়মার সঙ্গে। কান্তিবাবু জানান, দলের রাজ্য সম্পাদক বিমান বসুর নির্দেশেই দলীয় প্রতিনিধি দল এসেছে। তাঁর কথায়, “কপিলবাবুর মৃত্যুতে আমি ব্যথিত। ওঁর মায়ের জন্যও দুঃখ হচ্ছে।” বড়মার সঙ্গে কান্তিবাবুর আলাপ দীর্ঘ দিনের। যদিও অশক্ত শরীরে বড়মা এ দিন তাঁকে দেখে চুপ করেই ছিলেন। শুধু মঞ্জুলের দিকে তাকিয়ে বলেন, “এ সব আমার আর ভাল লাগছে না!”

simanta moitro kapilkrishna thakur kapil krishna thakur tmc mp motua leader state news online state news matua no crowd TMC MP
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy