ঘটনা ১: শিবরাত্রির দিন বগুলা থেকে ছোট গাড়ি ভাড়া করে নবদ্বীপের গঙ্গায় স্নান করে সাতশিবের পুজো দিতে এসেছিলেন নমিতা কুণ্ডু এবং দীপা কুণ্ডু। স্নানের আগেই তাঁরা দেখে রেখেছিলেন গঙ্গার ঘাট লাগোয়া হলুদরঙা ভাঙাচোরা বাড়িটি। ভেবেছিলেন, স্নানের পরে ওখানেই মহিলাদের পোশাক বদলানোর ব্যবস্থা আছে। সেই মতো স্নান সেরে উঠে তাঁরা সেই পলেস্তারা খসা জরাজীর্ণ বাড়িটার দিকে এগিয়ে যেতেই ঘাটের অন্য লোকজন হইহই করে উঠলেন, ‘‘আরে ওদিকে নয়, ওদিকে নয়। ওই নোংরা ঘরে কেউ যায় না। সাপখোপ রয়েছে।”
ভিজে পোশাকে একঘাট লোকের মধ্যে তখন রীতিমতো বিব্রত ওই দুই মহিলা। ঘাটে সেই সময় স্নান করছিলেন হাঁসখালির বাসিন্দা গীতা সরকার। তিনি ওই দুই মহিলাকে ডেকে নেন। তারপর ঘাটের ধারেই একে অপরকে কাপড় দিয়ে আড়াল করে কোনও রকমে পোশাক বদলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন তাঁরা। বেশ কয়েক বছর ধরে শিবরাত্রির দিন নবদ্বীপের গঙ্গায় স্নান করতে আসা গীতাদেবীর আক্ষেপ, “চোখের সামনে চারপাশে কত কিছুই তো গড়ে উঠল। কিন্তু নবদ্বীপের ঘাটে মহিলাদের পোশাক বদলানোর জন্য একটা আবডাল জুটল না।”
ঘটনা ২: ঠাকুরনগর থেকে সপরিবার নবদ্বীপে এসেছিলেন তপন বিশ্বাস। সঙ্গে ছিলেন তপনবাবুর স্ত্রী, কন্যা, পুত্রবধূ-সহ প্রায় বারো জন লোক। প্রথম রাত শহরের মঠ-মন্দির দেখে ভালই কেটেছিল। পরের দিন সকালে সবাই মিলে স্নান করতে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল তাঁদের। নবদ্বীপের রানিরঘাটে মহিলা-পুরুষ মিলিয়ে কয়েকশো মানুষ স্নান করছেন। খোলা ঘাটের ধারেই কোনও রকমে পোশাক বদল করছেন সকলেই। স্নানের ঘাটের এমন অবস্থা দেখে বিশ্বাস বাড়ির মহিলারা কিছুতেই স্নান করতে রাজি হননি। স্নানের আশা ত্যাগ করে মাথায় গঙ্গাজল ছিটিয়েই মহিলারা ফিরে যান। তপনবাবু নিজে স্নান করলেও ফেরার আগে বলছিলেন, ‘‘নবদ্বীপের মতো জায়গায় গঙ্গার ঘাটে শৌচাগার থাকবে না, এটা ভাবতেই পারছি না!”
নবদ্বীপের গঙ্গার ঘাটে এগুলো কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছেন পর্যটকেরা। নবদ্বীপ শহর অঞ্চলে গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে কম করে এক ডজন ঘাটে লোকজন নিয়মিত স্নান করেন। তাঁদের সিংহ ভাগই বহিরাগত পর্যটক। যাঁদের নবদ্বীপে আসার অন্যতম প্রধান একটি উদ্দেশ্য হল গঙ্গায় স্নান করে মহাপ্রভু দর্শন। এহেন নবদ্বীপের প্রায় বেশির ভাগ ঘাটেই নেই শৌচাগার, স্নানের পর পোশাক পরিবর্তন ও পানীয় জলের ব্যবস্থা। ফলে বারো মাসে তেরো পার্বণের শহর নবদ্বীপে প্রতিদিন মহিলারা বাধ্য হন সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়ে স্নান করতে। পর্যটক তো বটেই স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ, বছরের পর বছর ধরে এমনটাই চলে আসছে। অথচ এই নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই।
প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের’ অধীনে নবদ্বীপের গঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ ঘাটগুলিতে তৈরি হয়েছিল শৌচাগার ও পোশাক পরিবর্তনের ঘর। স্থানীয় পুরসভায় ক্ষমতায় তখন বামফ্রন্ট। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে সেই সব শৌচাগার এবং পোশাক পরিবর্তনের ঘরগুলি ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি। তারপরেও নবদ্বীপ পুরসভা নয় নয় করে আরও দেড় দশক বামেদের দখলেই ছিল। কিন্তু নবদ্বীপের স্নানের ঘাটের ওই শৌচাগার ও ঘরগুলির বন্ধ দরজা খোলার কোনও চেষ্টা হয়নি। অথচ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে নবদ্বীপের গুরুত্ব। সারা বছর দেশি বিদেশি পর্যটকের ভিড় লেগেই থাকে নবদ্বীপ-মায়াপুরে। ঝুলন, রথযাত্রা, বড়দিনের, নববর্ষের ভিড়ের পাশাপাশি রাস কিংবা দোলের মতো উৎসবে লাখো মানুষের গন্তব্য হয়ে উঠেছে নবদ্বীপ। শহরের অনান্য দিকে নানা চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন ঘটলেও নবদ্বীপের গঙ্গার ঘাট যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই।
ইতিমধ্যে নবদ্বীপের গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। বামেদের সরিয়ে নবদ্বীপ বিধানসভা এবং পুরসভার দখল নিয়েছে তৃণমূল। সেও প্রায় দু’দশক হয়ে গেল। তবুও দরজা খোলেনি বন্ধ শৌচাগারের। কাপড়ের আড়াল গড়ে উন্মুক্ত স্নানের ঘাটে মহিলাদের পোশাক বদলানোর সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। উল্টে পঁয়ত্রিশ বছর আগে তৈরি হওয়া সেই সব শৌচাগার এবং পোশাক পরিবর্তনের ঘরগুলি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীর্ণ থেকে জীর্ণতর হয়েছে। সংস্কার করা দূরে থাক, সেখানে এখন ঢুকতে ভয় পান লোকজন।
নবদ্বীপ পুর-কর্তৃপক্ষের সাফাই, গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যানের ওই ভবনগুলি নিয়ম মেনে পুরসভার হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। তৎকালীন বাম পুরবোর্ড ওগুলি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনও অর্থও বরাদ্দ করেনি। কিন্তু সেই বাম জমানা তো এখন ইতিহাস। নবদ্বীপ পুরসভা এই নিয়ে চতুর্থ বার তৃণমূলের দখলে। নবদ্বীপ বিধানসভা কেন্দ্রেও পর পর তিন বার জিতে পুণ্ডরীকাক্ষ সাহা মন্ত্রীও হয়েছেন। কিন্তু তারপরেও পর্যটকদের ভরসা গঙ্গার ঘাট এলাকার বাসিন্দা সুজিত দে’র মতো কিছু মানুষের বাড়ি। যেখানে সামান্য কিছু পয়সার বিনিময়ে তাঁরা স্নানের পরে নিশ্চিন্তে পোশাক বদলাতে পারেন। ব্যবহার করতে পারেন শৌচাগার। সুজিতবাবুর কথায়, “ দীর্ঘদিন মানুষের এই সমস্যা দেখে সামান্য পয়সার বিনিময়ে এই ব্যবস্থা করেছি। তাতে ওঁদেরও যেমন সুবিধা হয় তেমনি আমারও কিছু উপার্জন হয়। তবে উৎসবের দিনে বা বিশেষ তিথিতে ভিড়ের কারণএ ইনেককে ফিরে যেতে হয়।”
স্থানীয় বিধায়ক পুণ্ডরীকাক্ষ সাহার বক্তব্য, ‘‘নবদ্বীপের গঙ্গার ঘাট নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শুধু শৌচাগার বা পোশাক বদলের ঘর নয়, গঙ্গার পাড়ের ছবিটাই আমূল বদলে যাবে।’’ তবে নবদ্বীপ অবশ্য সেই আশ্বাসে বিশেষ ভরসা পাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বলছেন, ‘‘গঙ্গার ঘাট নিয়ে কোটি কোটি টাকার পরিকল্পনার কথা ঢের শুনেছি। এখন না আঁচালে কিছুই বিশ্বাস নেই।’