E-Paper

দুর্ব্যবহারের নালিশ তৃণমূলের, ‘বিবেচনাধীন’ ভোটার নিয়ে প্রশ্নের মুখে কমিশন

সোমবার এই বৈঠকে বিজেপি ছাড়া অন্য দলগুলি এসআইআর-প্রক্রিয়া নিয়ে নানা সমস্যার কথা বলেছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১০ মার্চ ২০২৬ ০৯:০১
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।


বিধানসভা ভোটের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে রাজ্যে এসে ৬০ লক্ষ মানুষের নাম এখনও ‘বিবেচনাধীন’ থাকা নিয়ে প্রত্যাশিত ভাবেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রশ্নের মুখে পড়তে হল নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ বেঞ্চকে। বিজেপি ছাড়া সব দলই কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রশ্ন তুলেছে। বামেরা সরাসরি বলেছে, বিবেচনাধীনদের বিষয়টি নিষ্পত্তি না-হওয়া পর্যন্ত ভোট করা যাবে না। পাশাপাশি, তৃণমূল কংগ্রেস মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে কোনও কথা না-শুনে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে। আর কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঠিক মতো ব্যবহার করা, ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ ওয়েলফেয়ার কমিটি’কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার মতো ১৬ দফা দাবি তুলেছে বিজেপি।

সূত্রের খবর, সোমবার এই বৈঠকে বিজেপি ছাড়া অন্য দলগুলি এসআইআর-প্রক্রিয়া নিয়ে নানা সমস্যার কথা বলেছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ও দুই কমিশনার সুখবীর সিংহ সাঁধু ও বিবেক জোশীর পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ভোটের আয়োজন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির মত জানতে চেয়েছিল। তাতে বিজেপি ও সিপিএম এক, সর্বোচ্চ দু’দফার কথা বলেছে। তৃণমূল নেতারা বৈঠকের পরে এই নিয়ে কিছু বলেননি। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্না-মঞ্চ থেকে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘আগে ভোটাধিকার দিতে হবে। তার পরে ভোটের দফা। এমনিতেই দফা রফা করব! এক দফায় করুন, রাজ্যের মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষ গণতান্ত্রিক ভাবে মাজা ভেঙে দেবে!’’

তৃণমূলের হয়ে রাজ্যের দুই মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, ফিরহাদ হাকিম এবং প্রাক্তন পুলিশ-কর্তা তথা দলের রাজ্যসভার প্রার্থী রাজীব কুমার বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। দিল্লিতে জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে সরব হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। সেই সুরেই বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে চন্দ্রিমার অভিযোগ, “আমি এক জন মহিলা, আমাকে বলছেন (জ্ঞানেশ), চিৎকার করবেন না! মহিলাদের প্রতি সম্মান নেই? প্রতি বার উনি একাই বলেন। এ বারেও তা-ই। কিছু ক্ষণ পরে ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, ‘আপনারা তো সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন। চেঁচাচ্ছেন।’ গিয়েছি তো, বেশ করেছি!” তৃণমূলের বক্তব্য, যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি, নতুন ভোটারদের অন্তর্ভুক্তি, মৃতদের বাদ যাওয়া নিয়ে যে নানা সন্দেহ হচ্ছে, তা নিরসন করা উচিত কমিশনের। পাশাপাশি, ফর্ম ৭-এর মাধ্যমে যাঁদের নাম নিয়ে আপত্তি, তাঁদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন রাজীব।

সূত্রের দাবি, যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি থাকা ভোটারদের একাংশ এ বার ভোট দিতে পারবেন কি না, কবে যোগ্য ভোটারদের অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলির প্রশ্নের মুখে কমিশনের তরফে কোনও সরাসরি বার্তা আসেনি। তবে আজ, মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর সংক্রান্ত মামলার শুনানি হওয়ার কথা। সেখানে যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির আওতায় যোগ্য-অযোগ্য নির্ধারণের কাজ কত দূর এগিয়েছে, তা-ও খতিয়ে দেখতে পারে শীর্ষ আদালত। এর পরেই হয়তো এই নিয়ে কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে বিভিন্ন শিবির।

কমিশনের বৈঠকে বিজেপি অভিযোগ করেছে, ২০১৩-র পরে থেকে রাজ্যে কোনও নির্বাচনই সুষ্ঠু ভাবে হয়নি। হিংসা-মুক্ত পরিবেশ, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ঠিক ভাবে ব্যবহার, ভোট লুট আটকানো, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ভোটের কাজে ব্যবহার না করা-সহ ১৬ দফা দাবি তুলেছেন বিজেপির প্রতিনিধি তাপস রায়, জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, শিশির বাজোরিয়া। পাশাপাশি, তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি সিইসি জ্ঞানেশ কুমার ‘আঙুল কেটে নেওয়া’ নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, সেই বিষয়ে কমিশন যাতে এফআইআর করে, সেই দাবিও বৈঠকে তুলেছে বিজেপি। তাপসের বক্তব্য, “জ্ঞানেশ কুমারের আঙুল কাটা মানে তো সংবিধানেরই আঙুল কাটা। তৃণমূলের এত বড় স্পর্ধা। হিংসা ও ভয়মুক্ত পরিবেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন চাই।” বিজেপি সূত্রে খবর, এই বিষয়ে জ্ঞানেশ বলেছেন, এটা সংবিধানের আঙুল, একশো কোটি ভোটারের আঙুল, যা চাইলেও কাটা সম্ভব নয়! জগন্নাথ জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে রাজ্য পুলিশ যে ভাবে ব্যবহার করছে, তা নিয়ে যে তাঁরা অসন্তুষ্ট। বাহিনী মোতায়েনের দায়িত্ব রাজ্য ও কলকাতা পুলিশের উপরে দেওয়া যাবে না বলেও দাবি তোলা হয়েছে।

বিবেচনাধীন ভোটারদের বিষয়টি নিয়ে বৈঠকে সরব হয়েছেন সিপিএমের তিন প্রতিনিধি রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম, শমীক লাহিড়ী, আফরিন বেগম। সেলিমের বক্তব্য, “কমিশন মেনেছে, আধিকারিকদের ভুলের জন্য যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির সমস্যা তৈরি হয়েছে। ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা, বিবেচনাধীন ৬০ লক্ষ ভোটারকে তালিকায় না-ফেরানো পর্যন্ত ভোট হবে না।” পাশাপাশি, বৈধ নথি দেওয়া সত্ত্বেও যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে বলে অভিযোগ, তাঁদের ক্ষেত্রে বাদের লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার দাবি তুলেছে সিপিএম। সেই সঙ্গে, যে আধিকারিকেরা এসআইআর-প্রক্রিয়ায় অনৈতিক কাজ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ, কালিগঞ্জে উপনির্বাচনের ফলপ্রকাশের দিন তামান্না খাতুন খুনের ঘটনায় কমিশনের পদক্ষেপ না-করার কারণ কী, তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে। বুথে সিসি ক্যামেরা থাকলেও, তার কন্ট্রোল রুমে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধি রাখার দাবি জানিয়েছে সিপিএম। বিবেচনাধীনদের প্রসঙ্গে একই দাবি তুলেছেন ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রতিনিধি সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। বৈঠকে ছিলেন আপ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির প্রতিনিধিরাও।

ভোট-আবহে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছেন কংগ্রেসের প্রতিনিধি প্রদীপ ভট্টাচার্য, আশুতোষ চট্টোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ বসুরা। প্রদীপ বলেছেন, “এক দফায় ভোট হলে আমরা খুশি হব। তবে এক, দুই বা তিন, যত দফাই হোক না কেন, আমাদের মূল দাবি, সার্বিক নিরাপত্তা।”

বিবেচনাধীন বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য অন্যত্র বলেছেন, “যে ৬০ লক্ষের কথা বলা হচ্ছে, এর মধ্যে কিছু নাম-পদবির বানান ভুল আছে। সেগুলো হয়ে যাবে। কিন্তু এর বড় অংশ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী। তাঁদের নাম থাকবে না।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

TMC Mamata Banerjee

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy