কোনও বার আলুর ধসা রোগে কৃষকদের মাথায় হাত পড়ে, কোনওবার অতিফলনের জেরে দাম মেলে না আলুর। ফলে ঋণে জালে পড়ে অনেক কৃষকই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এবারে সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে আলুর সঙ্গে পেঁয়াজ চাষের পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি দফতর। বিশেষ করে কোচবিহারে পেঁয়াজ চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে কৃষি দফতর সূত্রে দাবি করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজ্য কৃষি অধিকর্তা পরিতোষ ভট্টাচার্য কোচবিহার ১ নম্বর ব্লকের বেশ কিছু এলাকা পরিদর্শন করেন। চাষিদের সঙ্গে কথাও বলেন। পরে পেঁয়াজ চাষ নিয়ে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে জেলা কৃষি আধিকারিকদের প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
কোচবিহার ১ নম্বর ব্লকের কৃষি আধিকারিক রজত চট্টোপাধ্যায় বলেন, “পেঁয়াজ চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকরা আলুর সঙ্গে যদি কিছুটা পেঁয়াজ করেন তাহলে অন্তত তাঁদের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে না। দুটি ফসল ঠিকঠাক হলে লাভও হবে প্রচুর। সে কারণে আমরা কৃষকদের উৎসাহিত করছি।” তিনি জানান, পেঁয়াজ খেত থেকে তুলে বাজারে বিক্রি করলে প্রতি বিঘাতে অন্তত ২০ হাজার টাকা লাভের সুযোগ রয়েছে। ওই পেঁয়াজ দু’মাস সংরক্ষণ করলে লাভের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। স্থানীয় পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণের কথাও কৃষকদের জানানো হচ্ছে। পাশাপাশি, উদ্যানপালন দফতর থেকে পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য ঘর তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ওই ঘর তৈরিতে কৃষকদের সহযোগিতা করা হবে বলে উদ্যানপালন দফতর থেকে ঘোষণা করা হয়েছে।
কোচবিহার জেলা উদ্যান পালন দফতরের আধিকারিক খুরশিদ আলম বলেন, “জেলায় বাইরের রাজ্য থেকে পেঁয়াজ আসে। অথচ কোচবিহারে পেঁয়াজ চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারও রয়েছে। তাই আমরা কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে ওই উদ্যোগ নিয়েছি।” তিনি জানান, ওই পদ্ধতিতে ২৫ মেট্রিক টন পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাবে।
কৃষি দফতর সূত্রের খবর, কোচবিহার জেলায় এবারে ৩১ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। গত বছর আলু চাষ করা হয়েছিল ২৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। গত বছর ধসার প্রকোপে নষ্ট হয়েছিল প্রচুর আলু। তা নিয়ে ক্ষোভ চরমে ওঠে। এবারে আলু উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা ফের ক্ষতির মুখে পড়ে। পাইকারি বাজারে আলুর দাম ৩ টাকার নিচে নেমে যায়। তা নিয়ে কোচবিহার তো বটেই ধূপগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের বহু এলাকা কৃষকদের আন্দোলনে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কোচবিহারে রাস্তায় আলু ফেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে বিক্ষোভে সামিল হয় কৃষকরা। সরকার বাধ্য হয়ে শিবির করে সাড়ে ৫ টাকা দরে আলু কিনতে শুরু করে। অভিযোগ, সামান্য আলু কেনার পর ওই শিবির বন্ধ হয়ে যায়। ফলে অনেক আলু নষ্ট হয়ে যায়।
সেখানে কোচবিহার জেলায় মাত্র সাড়ে ছ’শো হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়। এবারে কোচবিহারে ১ নম্বর ব্লকে প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় দশ কুইন্টাল করে পেঁয়াজের ফলন হয়েছে। এই ব্লকে পঞ্চাশ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। কৃষি আধিকারিকরা জানান, আলু চাষে লাভ অনেক। এক বিঘা আলু চাষে ঠিকঠাক ফলন হলে পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হতে পারে। দফতরের এক আধিকারিক বলেন, “আলুতে লাভ যেমন আছে, ঝুঁকিও আছে। সেখানে পেঁয়াজ চাষে সেই ভয় নেই। স্বাভাবিক ভাবেই আলুর সঙ্গে পেঁয়াজ চাষ করলে কৃষকদের ঝুঁকি কমবে।’’
তবে কৃষকরা এখনও সংশয়ে। ঘুঘুমারির এক আলু চাষি নন্দ বর্মন বলেন, “ফলন ভাল হলে আলুতে লাভ হয়। কিন্তু কয়েক বছর যাবত আলু নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। হয় ফলন ভাল হচ্ছে না, না হলে অতিরিক্ত ফলনে দাম পাচ্ছি না। পেঁয়াজ চাষ কখনও করিনি। দেখি কী করি।’’