Advertisement
E-Paper

খুনের কথা ছড়াচ্ছে ফোনে, অধরা দোষীরা

এক গৃহবধূকে তাঁর স্বামী, দুই ছেলে ও এক পুত্রবধূ মিলে খুন করেছেন বলে অভিযোগ আগেই উঠেছে। এবার ওই মহিলার মৃত্যুর ব্যাপারে পরিবারের পরিচারিকা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে যা বলেছেন, তার ‘অডিও রেকর্ডিং’ এক বাসিন্দা ‘হোয়াটস অ্যাপে’ প্রকাশ করে দেন। তা ছড়িয়ে পড়তে ডুয়ার্সের ফালাকাটায় সাধারণ মানুষ পুলিশের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। গত সোমবার ওই ঘটনা নিয়ে ফালাকাটায় মিছিল বের করেন কয়েক হাজার বাসিন্দা। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি তুলে থানা এবং বিডিও অফিসে বিক্ষোভ দেখানো হয়।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০১৫ ০২:৩৪

এক গৃহবধূকে তাঁর স্বামী, দুই ছেলে ও এক পুত্রবধূ মিলে খুন করেছেন বলে অভিযোগ আগেই উঠেছে। এবার ওই মহিলার মৃত্যুর ব্যাপারে পরিবারের পরিচারিকা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে যা বলেছেন, তার ‘অডিও রেকর্ডিং’ এক বাসিন্দা ‘হোয়াটস অ্যাপে’ প্রকাশ করে দেন। তা ছড়িয়ে পড়তে ডুয়ার্সের ফালাকাটায় সাধারণ মানুষ পুলিশের ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। গত সোমবার ওই ঘটনা নিয়ে ফালাকাটায় মিছিল বের করেন কয়েক হাজার বাসিন্দা। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি তুলে থানা এবং বিডিও অফিসে বিক্ষোভ দেখানো হয়।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, ওই পরিচারিকার আট মিনিট চল্লিশ সেকেন্ডের যে বক্তব্য হোয়াটস অ্যাপে শোনা যাচ্ছে, তা এলাকার অনেকের ফোনেই রয়েছে কিন্তু পুলিশ সে ব্যাপারে কোনও উৎসাহ দেখাচ্ছে না কেন? মহকুমা পুলিশ আধিকারিক অম্লান ঘোষের কথায়, ‘‘ওই পরিচারিকাকে থানার অফিসারেরা জেরা করেছেন। ওই ঘটনায় তাঁকে সাক্ষী রাখা হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি। হোয়াটস অ্যাপে তাঁর ভয়েস রেকর্ড বলে যা ছড়িয়েছে, তা সংগ্রহ করার জন্য থানার আধিকারিকদের বলেছি।’’ তবে ১০ দিন ধরে স্বামী সহ মোট পাঁচ জন ফেরার হওয়ার পরেও কেন পুলিশ তাদের এখনও সন্ধান করতে ব্যর্থ, তা নিয়েও সরব হয়েছেন বাসিন্দারা।

ফালাকাটা থানার আইসি ধ্রুব প্রধান বলেছেন, ‘‘ওই পরিচারিকা প্রথম দিন আত্মহত্যার কথা বলেছিলেন। মামলা দায়ের হওয়ার তিন দিন বাদে এসে পরিচারিকা হত্যার ঘটনা স্বীকার করেছে বলে তাঁকে মূল সাক্ষী হিসাবে রাখা হয়েছে। তবে ওই পাঁচ জনের খোঁজে ডুয়ার্সের সব সম্ভাব্য জায়গাগুলিতে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছি আমরা।’’

Advertisement

গত ২৯ মার্চ ফালাকাটা শহরের অরবিন্দ পাড়া এলাকার বাসিন্দা পূরবী কর (৪৮)-এর দগ্ধ দেহ বাড়ির তিন তলার ছাদ থেকে উদ্ধার করা হয়। সম্প্রতি যে ‘ভয়েস রেকর্ড’ মোবাইলে ঘুরছে সেখানে ২৮ মার্চ বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিবরণ বলে কিছু তথ্য দেওযা হয়েছে। যেমন, বলা হয়েছে, ছোট ছেলের স্ত্রীর সঙ্গে দুপুরে এক দফা ঝগড়া হয় শাশুড়ি পূরবীদেবীর। সে সময় ছোট ছেলে মা কে মারতে যায়। পূরবীদেবী কান্নাকাটি করেন। বিকালে সব স্বাভাবিক ছিল। বাড়ির বাইরে পায়চারি করেন। রাতে খাবার টেবিলে বড় ছেলের জন্মদিন পালন করা নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। পূরবীদেবীর সঙ্গে তাঁর স্বামীর বচসা হয়। ওই পরিচারিকার বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় স্বামীকে পূরবীদেবী বলেন, ‘‘অন্য মহিলার সঙ্গে ফুর্তি কর আর আমাকে দেখতে পার না।’’ তা শুনে বড় ছেলের স্ত্রী এসে পূরবীদেবীকে চড় মারেন বলে অভিযোগ।

এরপর তাঁর স্বামী তাঁকে মারধর করে একটি ঘরে নিয়ে যান বলে অভিযোগ। আরও অভিযোগ, সে ঘরে পূরবীদেবীর গলা চেপে রাখে ছোট ছেলে। বড় ছেলে মায়ের দু’হাত ধরে রাখেন ও তাঁর স্বামী পা ধরে রাখেন বলেও অভিযোগ। সেখানেই মারা যান তিনি। অভিযোগ, মুখ না খোলার জন্য পরিচারিকাকে প্রলোভন এবং মেরে ফেলার হুমকি দেয় ছোট ছেলে। শেষ রাতে বড় ছেলের স্ত্রী মৃত শাশুড়ির শরীর থেকে রাতের পোশাক খুলে শাড়ি পরান। পরে দেহটি ছাদে নিয়ে যান তাঁরা। সেখানেই দেহটি পোড়ানো হয় বলে অভিযোগ। পরিচারিকা চিৎকার করলে বড় ছেলের স্ত্রী মুখ চেপে রাখে। ভোর বেলা লোকজন ধোঁয়া দেখে ছুটে আসেন বাড়িতে। ভয়ে সে সময় কোনও কথা বলেননি বলে ওই পরিচারিকার দাবি। এই পুরো ঘটনাটাই বলেছেন ওই পরিচারিকা। যা রেকর্ড করে হোয়াটস অ্যাপে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটিকে নিছক আত্মহত্যা বলে চালাবার চেষ্টা করেন পূরবীদেবীর স্বামী সহ দুই পুত্র ও তাঁদের স্ত্রীরা। ঘটনার দিন থানায় লিখিত ভাবে তাঁর ছেলে জানিয়ে দেন পূরবীদেবী আত্মহত্যা করেছেন বলে। তবে পাড়ার বাসিন্দারা অবশ্য তাঁদের দাবি উড়িয়ে দেন।

গত ৫ এপ্রিল পূরবীদেবীর মা সুভাষপল্লির বাসিন্দা গীতা দে সরকার ফালাকাটা থানায় মেয়ের স্বামী, তাঁর দুই ছেলে এবং দুই পুত্রবধূর নামে হত্যার অভিযোগ দায়ের করেন। সে দিন সন্ধ্যায় গা ঢাকা দেন অভিযুক্তরা। ওই ঘটনায় পর ফালাকাটার বাসিন্দারা প্রতিবাদ মিছিল বের করে অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির দাবি করেন। তবে তারই মধ্যে পরিচারিকার জবানবন্দি হিসেবে দাবি করে কিছু কথা হোয়াটস অ্যাপের মাধ্যমে ছড়াতে শুরু করে। তুফানগঞ্জের বাসিন্দা ওই পরিচারিকা স্বামী পরিত্যক্তা। এক মেয়ে রয়েছে। তবে বয়ান দেওয়ার পর তিনি বাড়ি চলে যান।

ওই মহিলা অরবিন্দপাড়ার আরও দুই বাড়িতে এক বছর পাঁচ মাস ধরে পরিচারিকার কাজ করতেন। রাতে পূরবীদেবীর বাড়ি থাকতেন। থানায় অভিযোগ দায়ের হবার পর গত ৮ এপ্রিল ওই পরিচারিকা ফালাকাটা সুভাষ গার্লস হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষিকা সন্ধ্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন এবং সে সময় তার বয়ান রেকর্ড করে হোয়াটস অ্যাপে তুলে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছেন সন্ধ্যাদেবী। তাঁর কথায়, ‘‘ঘটনার পরের দিন সকালে ওই পরিচারিকা কিছু বলেননি আমাদের। পরে লোকজন এসে চাপ দিতে কী ভাবে পূরবীদেবীকে মেরে ফেলা হয়েছে, তা বিস্তারিত ভাবে জানান। পরে থানায় গিয়েও সমস্ত কথা খুলে বলেন।’’

ওই পরিচার কণ্ঠস্বর শোনার পর পূরবীদেবীর মেয়েও মনে করেন তাঁর মা-কে খুন করা হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘মা আত্মহত্যা করেছে বলে প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু বাবা, দাদা ও বৌদদিদের কান্নাকাটিতে তা বিশ্বাস করি। পরে যখন পরিচারিকার কণ্ঠস্বর মোবাইলে শুনি, তখন বুঝে যাই মা-কে হত্যা করা হয়েছে। আমি চাই ওদের শাস্তি হোক।’’

গীতাদেবীর কথায়, ‘‘ঘটনার দিন কলকাতায় ছিলাম। ছোট নাতি আমায় ফোন করে জানায়। তবে আমার মেয়ে আগুন দেখলে ভয় পায় ও আত্মহত্যা করতে পারে না বলে আমি নিশ্চিত ছিলাম। অনুমান করছিলাম, আমার মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরে পরিচারিকার চেনা কণ্ঠস্বর শুনে আমার আশঙ্কা সত্য হল।’’ এদিকে, দু’দিন আগে আলিপুরদুয়ার থেকে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে অগ্নি দগ্ধ হয়ে মহিলার মৃত্যু হয়েছে বলে থানার আই সি ধ্রুব প্রধান জানিয়েছেন। ওই ঘটনায় আজ শুক্রবার গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি মিছিল বের করে প্রতিবাদ জানাবেন।

whtasapp description planned murder audio description of murder falakata murder falakata polic falakata housewife murder
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy