Advertisement
E-Paper

আবার বক্সার জঙ্গল দিয়ে ছুটবে ট্রেন! চার দশক বাদে হঠাৎ রেলের ঘোষণায় বিতর্ক, ব্যাঘ্র সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প মান্যতা পাওয়ার পর থেকে রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিবেশের কথা ভেবেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। হঠাৎই সেই রেলপথ পুনরুদ্ধারের ঘোষণা করেছে রেল। তা-ই নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:৩৪
বক্সা অভয়ারণ্য দিয়ে আবার ছুটবে ট্রেন?

বক্সা অভয়ারণ্য দিয়ে আবার ছুটবে ট্রেন? —ফাইল চিত্র।

আশির দশকে শেষ বার ট্রেন চলেছিল রাজাভাতখাওয়া-জয়ন্তী রেলপথে। আলিপুরদুয়ারে ডলোমাইট, চা এবং কাঠ সংগ্রহের জন্যই ওই রেলপথ ব্যবহার করা হত। তার পর পরিবেশ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞায় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছে। ধীরে ধীরে রেলপথের দু’ধারে গড়ে ওঠে জনবসতি। প্রায় চার দশক বাদে সেই রেলপথই পুনরুদ্ধারে কেন্দ্র অর্থ বরাদ্দ করায় শুরু হয়েছে বিতর্ক। ডুয়ার্সের স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তায় পরিবেশকর্মীরা। রেলপথের সংরক্ষণ এবং নতুন করে ট্রেন চালানোর উদ্যোগের কারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

১৯৮৩ সাল বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প মান্যতা পাওয়ার পর থেকে রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরিবেশের কথা ভেবেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গত শুক্রবার একটি বিবৃতিতে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক কপিঞ্জলকিশোর শর্মা জানান, সংশ্লিষ্ট রেলপথ পুনরুদ্ধারের জন্য ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ১৫.১৩ কিলোমিটার রেলপথ সংস্কার হলে আবার রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত ট্রেন ছুটবে। ওই রেলপথ ঘিরে যে সকল বসতি রয়েছে, সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে।

এই ঘোষণার পরে একাধিক প্রশ্ন উঠছে।

প্রথমত, যে উদ্দেশ্যে রাজাভাতখাওয়া-জয়ন্তীর রেলপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেই বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ভবিষ্যৎ কী হবে? যে রেলপথ জয়ন্তীতে গিয়ে শেষ হচ্ছে, সেখানে কাদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করল রেল মন্ত্রক? ব্যাঘ্র প্রকল্পের মাঝখান দিয়ে ট্রেন ছুটিয়ে আখেরে কার কী লাভ?

উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের ডিআরএম দেবেন্দ্র সিংহ বলেন, ‘‘রেলপথটি পুনর্নির্মাণের জন্য ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।এর বাইরে সম্পূর্ণ রিপোর্ট বা আরও কোনও তথ্য আমাদের হাতে পৌঁছোয়নি।’’ বন দফতরের ছাড়পত্র কি আছে? ডিআরএমের জবাব, ‘‘এখনও সে সব নিয়ে আলোচনা হয়নি। ছাড়পত্র বা বাকি যে সব ক্লিয়ারেন্স প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে।’’ কিন্তু শুধুমাত্র পর্যটনের সুবিধার জন্য এমন উদ্যোগ নেওয়া হল কি না, তারও সদুত্তর দেয়নি রেল।

সংশ্লিষ্ট কাজে অর্থ বরাদ্দের আগে পরিবেশের উপর প্রভাব সংক্রান্ত কোনও সমীক্ষা করা হয়েছিল কি না, কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রক ছাড়পত্র দিয়েছে কি না ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর বা ব্যাখ্যা নেই উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের কাছে। এই পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত বিভিন্ন পরিবেশ এবং বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ সংগঠন। পরিবেশকর্মী অনিমেষ বসুর কথায়, ‘‘যেখানে মানুষই নেই, বনবস্তি ইতিমধ্যে তুলে দেওয়া হয়েছে, সেখানে রেল চালানো একটা অবান্তর পরিকল্পনা। বন্যপ্রাণের ক্ষতি ছাড়া লাভের কিছু তো দেখতে পাচ্ছি না। আসলে এই রেলপথটির প্রয়োজনই নেই। আগেও এই রেলপথ সাধারণ মানুষের জন্য ছিল না। সেই সময় শুধু বাণিজ্যিক কারণে ট্রেন চলত। ‘টাইগার রিজ়ার্ভ’ ঘোষণা হওয়ার পরেই তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন ঠিক কোন উদ্দেশ্য নিয়ে, কার ভাল চেয়ে রেলপথ তৈরি হচ্ছে, জানা নেই।’’

বন্ধ হয়ে যাওয়া এই রেলপথ দিয়ে এক সময় টয় ট্রেন চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব। রেলের এই বিবৃতির পর তৃণমূল নেতা বলছেন, ‘‘রাজাভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত যে রেললাইনটি রয়েছে, ওই জায়গাটি ভীষণই সুন্দর। পর্যটনের স্বার্থে সেখানে ছোট ট্রেন চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু তার বাস্তবায়ন হয়নি।’’ শিলিগুড়ির মেয়রের দাবি, এই ঘোষণার নেপথ্যে রয়েছে রাজনীতি। সামনেই পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোট। তার আগে এমন নানাবিধ ঘোষণা এবং পরিকল্পনার কথা বলে মানুষকে আকর্ষিত করার চেষ্টা করছে বিজেপি। তাতে পরিবেশের উপর কী প্রভাব পড়বে কিংবা আদৌ মানুষের কাজে কতটা আসবে, সে নিয়ে ভাবনাচিন্তাই করা হয়নি।

যদিও আলিপুদুয়ারের বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গার দাবি, মানুষের কথা ভেবে সুচিন্তিত ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ওই রেলপথ ফের চালু হলে আঞ্চলিক অর্থনীতির উন্নয়ন হবে। তবে বিতর্ক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘রাজ্য এবং কেন্দ্র, দুই সরকার মিলে এই সিদ্ধান্ত নেবে। সকলের ভালর জন্য যা হবে সে-ই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’’

বক্সার ব্যাঘ্র প্রকল্প দিয়ে রেলপথ চালু হলে পর্যটনে তার সুফল কতটা মিলবে তা নিয়ে দ্বিধায় সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের পেশাদার এবং বিশেষজ্ঞেরাও। হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজ়ম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সম্পাদক সম্রাট সান্যাল বলেন, ‘‘আগে এই পথে ট্রেন চলত এটা সত্যি। কিন্তু বক্সার টাইগার রিজার্ভ ঘোষণার পর পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের কথা ভেবেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ট্রেন। সে সব মাথায় রেখে নিশ্চয়ই রেলের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। আমার মনে হয় বন এবং পরিবেশ দফতরের সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’’

বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ফিল্ড ডিরেক্টর অপূর্ব সেন জানান, তাঁদের কাছে এই মুহূর্তে নিয়ে কোনও তথ্য নেই। রেল থেকে এ সংক্রান্ত কোনও চিঠিও পাননি।

Buxa Forest train Indian Railways
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy