চিকিৎসক হিসাবে প্রত্যেক রোগীকে পরিষেবা দেওয়া তাঁর কর্তব্য। কিন্তু সরকারি মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক বলছেন, পুলিশের চিকিৎসা তিনি করবেন না! প্রথমে সমাজমাধ্যমে পোস্ট এবং পরে মৌখিক ঘোষণায় শোরগোল কোচবিহারে।
কোচবিহারে মহারাজা জিতেন্দ্র নারায়ণ মেডিক্যাল কলেজের শল্য চিকিৎসক অসিত চক্রবর্তী পুলিশের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ। কারণ, পুলিশ নাকি কাজের নয়! কারণ? চিকিৎসক জানান, গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর কোচবিহারের মীনাকুমারি চৌপতিতে তাঁর ভাড়া করা ফ্ল্যাট থেকে ৫ লক্ষ টাকা চুরি হয়ে যায়। পুলিশে অভিযোগ করেছেন। তার পর দীর্ঘ কয়েক মাস কেটে গেয়েছে। কিন্তু চোর ধরতে পারেনি পুলিশ। অসিতের দাবি, অভিযুক্তদের তিনি চেনেন। তাঁরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তার পরেই ফেসবুকে পুলিশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন ওই চিকিৎসক। তিনি বলেন, ‘‘কোচবিহারের পুলিশ-প্রশাসন ব্যর্থ। কোতোয়ালি থানায় এবং পুলিশ সুপার দফতরে লিখিত অভিযোগ করার পরেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।’’ তিনি জানান, তাঁর ভাড়া করা ফ্ল্যাটে চুরির দিন তিনি অপারেশন থিয়েটারে ব্যস্ত ছিলেন। হঠাৎ পরিচারিকা তাঁকে খবর দেন যে, আলমারি থেকে ৫ লক্ষ টাকা চুরি হয়েছে। তার পর তিনি ওই পরিচারিকা, আবাসনের নিরাপত্তারক্ষী এবং গ্যাস ডেলিভারি বয়ের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেন। তারও কিছু দিন পর জেলা পুলিশ সুপারের দফতরে গিয়ে গাড়িচালক এবং এক জন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টিভের নামেও অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি জানান, ওই টাকা রেখেছিলেন স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য।
কিন্তু মাসের পর মাস চলে যাওয়ার পরেও চুরির কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। তাই খাপ্পা হয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন। একটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘কোচবিহারে একের পর এক চুরি হচ্ছে। ডাক্তারদেরও (জিনিস চুরি) হয়েছে। কারও কোনও জিনিস উদ্ধার হয়নি। কেউ গ্রেফতার হননি।’ তিনি আরও লেখেন, ‘পুলিশ সব সময় ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। তাই দয়া করে আমার আউটডোরে বা ইনডোরে কোনও পুলিশ ট্রিটমেন্টের জন্য আসবেন না। এমজেএন মেডিকেল কলেজে কোনও পুলিশের ট্রিটমেন্ট করব না।’
শুধু তা-ই নয়, কোথাও আবার পুলিশের রক্তদান শিবিরের ছবি পোস্ট করে ওই চিকিৎসক লিখেছেন, ‘এগুলো পুলিশের কাজ?’ অসিত এখন স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতায় রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছি। কোচবিহারের থানার যে অফিসার আমার এই কেস দেখছেন, তিন-চার মাস যাবৎ তিনি আমার ফোন ধরছেন না। এমনকি, এসপি অফিসে গেলেও আমাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। তার পরেও পুলিশের সঙ্গে দেখা হলে একগাল হাসি নিয়ে বলছে, ‘আমরা তো করছি। দেখছি।’ কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।’’ চিকিৎসক আরও বলেন, ‘‘এই চুরির ঘটনা নিয়ে আমি যখনই ছোটাছুটি করি, তখনই আমার উপর আক্রমণ হয়। আমার গাড়িচালক আমার উপর ইতিমধ্যে একবার আক্রমণ করেছে।’’ তার পরে চিকিৎসকের প্রশ্ন, ‘‘ডাক্তারকে যদি পুলিশ-প্রশাসন কুকুর-ছাগলের মতো তাড়িয়ে দেয়, তাহলে সেই ডাক্তার কি পুলিশ-প্রশাসনের কাউকে পরিষেবা দেবে? আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনও পুলিশকর্মীর চিকিৎসা করতে রাজি নই। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি আমায় জোর করেন, তখন আলাদা বিষয়।’’
চিকিৎসকের এমন অবস্থান নিয়ে কোচবিহার এমজিএন কলেজের এমএসভিপি সৌরদীপ রায় বলেন, ‘‘যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি মেডিক্যাল কলেজের ক্যাম্পাসের বাইরে হয়েছে। সেই বিষয়ে আমি অবগত নই। কিন্তু কোনও ডাক্তার কাউকে চিকিৎসা করবেন না, এটা বলতে পারেন না। আমরা সরকারি চাকরি করি। স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে জড়িত আমরা সকলে চেষ্টা করি রোগীদের সুস্থ করে তুলতে।’’
আরও পড়ুন:
চিকিৎসকের অভিযোগ এবং নির্ঘোষ নিয়ে কোচবিহার জেলার পুলিশ সুপার সন্দীপ কাররা বলেন, ‘‘এ ভাবে ওঁর বলা উচিত হয়নি। পুলিশ তো আর চুরি করেনি! পুলিশ চেষ্টা করছে চোর ধরার। মামলা রুজু হয়েছে যখন, তদন্তও চলছে। হতে পারে তদন্তের স্বার্থেই কিছুটা দেরি হচ্ছে। কী কারণে দেরি, তা আমি খতিয়ে দেখব। কিন্তু চিকিৎসক হিসাবে উনি এটা বলতে পারেন না। ওঁরা এই পেশায় ঢোকার আগে শপথ করেন, সকলের চিকিৎসা করবেন।’’