Advertisement
২৭ নভেম্বর ২০২২
Durga Puja 2022

ফড়িংয়ের ডানায় সে কি সুখ না বেদনা

দুর্গাপুজো এলে এগুলো মনে হয়।  হঠাৎ করেই এক দিন সকালে প্রবল ভাবে ওড়াওড়ি করে রঙিন ফড়িং। গভীর রাতে বাড়ি ফেরার সময় হঠাৎ ভরিয়ে দেবে একটি শিউলির গন্ধ।

অঙ্কন: অমিতাভ চন্দ্র

অঙ্কন: অমিতাভ চন্দ্র

ঈশানী দত্ত রায়
ঈশানী দত্ত রায়
শেষ আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৮:২৩
Share: Save:

গাছের পাতায় একটু রোদ, ইটের ভাঙা কাঠামোয় সবুজ পাতা, ঘাসের আগায় কাঁচপোকা, আলগোছে ফুটে থাকা টকটকে লাল দুপুরে চণ্ডী ফুল। লরি ঠাসা, ডিজ়েলের গন্ধ ভরা ব্রিজ থেকে তাকিয়ে দেখা বিশাল নীল আকাশে সাদা মেঘ নিস্তব্ধ। একান্ত।

Advertisement

এক শিল্পী একজনকে বলেছিলেন, এই যে পর্দায় এসে পড়েছে কমলা রঙের আলো, এটা ভোগ না করেই মরে যাব?

সুদীপ্তা সেনগুপ্ত, আন্টার্কটিকায় যাওয়া বাঙালি ভূতাত্ত্বিকের কাছে শুনেছিলাম এক দৃশ্যের কথা। কোনও স্ক্যান্ডেনেভীয় দেশে তিনি গিয়েছিলেন কাজে। কাজ সেরে পথ হারিয়েছেন। রাত হয়েছে। চাঁদের আলোয় হেঁটে হেঁটে ফিরছেন। হঠাৎ, বনের মধ্যে এসে দাঁড়াল একটা বিরাট শিংওলা হরিণ। তাঁরাও হরিণের দিকে তাকিয়ে, হরিণও তাঁদের দিকে তাকিয়ে। কিছুক্ষণ দাঁড়াল, তার পরে চলে গেল। উনি বলেছিলেন, ‘‘চাঁদের আলোয় হরিণটা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃশ্য। এ কি কম ভোগ করা?’’

দুর্গাপুজো এলে এগুলো মনে হয়। হঠাৎ করেই এক দিন সকালে প্রবল ভাবে ওড়াওড়ি করে রঙিন ফড়িং। গভীর রাতে বাড়ি ফেরার সময় হঠাৎ ভরিয়ে দেবে একটি শিউলির গন্ধ। পূর্ণ ছাতিমের মাথায় পূর্ণ চন্দ্র। হারানো প্রিয়জনের স্মৃতিতে হু হু করে উঠে আসবে কান্না। পুজো আসে এ ভাবেই। বিষাদ নিয়ে। যে কোনও আনন্দের মতো। শেষ হওয়ার বেদনা না থাকলে আনন্দ অসম্পূর্ণ। পুজোও তো তেমন।

Advertisement

হাতে ফুলঝুরি। মাথায় রুমাল বেঁধে দিয়েছে মা, তুবড়িতে আগুন দিয়েছে, পাঁচিল থেকে মোমবাতি নিয়ে পালাল দরিদ্র শিশু। পুরনো জামা গায়েই। মাথায় হিম পড়ছে। ছোট মনের বেদনা শুরু হয় ষষ্ঠী থেকে লোডশেডিং-ফ্রক পরে ঠাকুর দেখতে শুরু করার মধ্যেই।

‘দ্য আওয়ারস’ ছবির অন্যতম চরিত্র ক্ল্যারিসা ভন বলছে, “I remember one morning getting up at dawn. There was such a sense of possibility. You know, that feeling. And I... I remember thinking to myself: So this is the beginning of happiness, this is where it starts. And of course there will always be more...never occurred to me it wasn't the beginning. It was happiness. It was the moment, right then.”— ‘সকালে উঠে মনে হল, কত কিছু করার আছে, ঠিক সেই মুহূর্তের অনুভবটা, এই যে সামনে কত কিছু, অনন্ত সম্ভাবনা, মনে হল, এটাই কি সুখের শুরু, এ ভাবেই শুরু হয়। আরও, আরও কিছু পাব, আরও আরও কিছু সুখ, আনন্দ। বুঝতেই পারিনি, শুরু নয়, ওইটাই, ওই মুহূর্তটাই আনন্দ, সুখ।’

এই সংলাপেও কি কোথাও নেই সেই চোরা বিষাদটা?

অনেক আগে পুজোর একটা খুব প্রিয় গান ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের, সেদিন তোমায় দেখেছিলাম

ভোরবেলায়,

তুমি ভোরের বেলা হয়ে

দাঁড়িয়েছিলে

কৃষ্ণচূড়ার ওই ফুলভরা

গাছটার নিচে

আমি কৃষ্ণচূড়ার সেই স্বপ্নকে

আহা, দু’চোখ ভরে দেখে নিলাম।

এই যে তুমি ভোরের বেলা হয়ে দাঁড়িয়েছিলে, সেখানেও দু’চোখ ভরে দেখে নেওয়ার সুখ, কথা হল না, ‘শুধু বুঝলাম, আমি বুঝলাম

এক নতুন বেদনা খুঁজে পেলাম’।

একটা ভোর, একটা গাছ, একটা সমুদ্র, একটা সুখ বলে অনুভূতির ফুলে ওঠা, সেটাই কি বেদনা নয়?

তবে কি উৎসবের কথা উঠলেই বিষাদ আনতে হয়, এসে যায় অতীত-চারণ? বর্তমানকে ধারণ করাই কি যথেষ্ট নয়? রাস্তা ধরে জনস্রোত চলছে, নতুন পোশাক, বিভিন্ন ছাঁদের, বিভিন্ন মানের, শহুরে পোশাকের মধ্যে এখনও চোখে পড়ে অজস্র তেলা চুলে ফুল, নেড়া মাথায় রিবন অথবা বেলুন, হাঁটতে হাঁটতে ছেঁড়া চটি, রাস্তার ধারে অজস্র স্টলে ক্লান্ত পায়ে, ক্লান্ত শরীরে ঢুকে যাচ্ছে চাউমিন, শস্তা সস, রোল, ফুচকা, লজেন্স, ঠান্ডা পানীয়ের বোতল, হাই উঠছে। এত প্রাণশক্তি, বারোমাস্যা দুঃখের মধ্যে বাসে এসে, হেঁটে এসে একদিনের আনন্দ, সেফটিপিন দিয়ে গত বছরের নতুন জামা আটকানো, কম কী? রাস্তা থেকে সরে গিয়ে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দেখা যাক এই অনন্ত স্রোত, অন্যের সুখ দেখার সুখ।

কুমোরপাড়ায় তৈরি হচ্ছে মূর্তি। দেখে, ইদানীং সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ে। বছর ১০ আগে দেখা। রাস্তার ট্রাফিক আইল্যান্ডে বসা বা দাঁড়ানো। একেবারেই নগ্ন, সুঠাম, নতুন কাপড় দিয়েছে কেউ, কিন্তু তা পায়ের তলায় লুটোচ্ছে। কাটা কাটা চোখ মুখ, অপরিষ্কার। পুরো ভঙ্গিটাই ধনুকের ছিলার মতো। রাস্তার লোক দেখছে, জল, চাদরও আলগোছে দিয়ে যাচ্ছে কেউ। কিন্তু মেয়েটির ভ্রূক্ষেপ নেই। দুই বিকেলে দেখেছিলাম। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় খবর দিতে দিতে সে আর নেই। আশপাশের কেউ বলতে পারেননি, মেয়েটির কী হল, পুলিশ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করল না অন্য কিছু?

বছর খানেক আগে সংবাদপত্রেই এক বৃদ্ধার কথা পড়েছিলাম। স্মৃতি নেই। শুধু মনে রয়েছে নিজের স্কুলের নাম। প্রশ্ন করলে শুধু বলতে পারেন সেই নামটাই। শুধু যেতে চান সেই স্কুলে।

এক সদ্যবেদনাহত চেয়েছিলেন স্মৃতিটাই চলে যাক। পুরনো সব কিছু চলে যাক, থাকুক বর্তমান, আসুক ভবিষ্যৎ।

হয় তাই?

যদি হয়, যদি থাকে শুধু অনন্ত নীল, কাশ, ফড়িংয়ের ওড়াওড়ি, চমচমে জ্যোৎস্না।

একটি ফড়িংয়ের ডানায় তবু বেদনা অপেক্ষা করবে।

পাঁচ দিনের উৎসবের পর কেনই বা মাটির প্রতিমার চোখ ছলছল করে।

করে। তা আমাদেরই চোখ বলে!

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.