E-Paper

উৎসাহের আতিশয্যে হানাহানি কাম্য নয়

এই কৃতিত্ব কিন্তু অনেকটা ম্লান হয়ে যেতে পারে যদি ফলপ্রকাশের পরে নতুন করে শুরু হওয়া হিংসা বন্ধ না করা যায়।

শৌভিক রায়

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৮:২৬
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

এ রাজ্যের অধিকাংশ মানুষেরই একটা বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন মানেই হিংসা। এই ভাবনার জন্য রাজ্যবাসীকে যে খুব বেশি দোষ দেওয়া যায়, সেটাও নয়। গত শতকের সত্তরের দশকে যখন প্রথম বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন থেকে শুরু করে ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন অবধিও নির্বাচনোত্তর সন্ত্রাসের হাড়হিম দৃশ্য দেখেছিল রাজ্য। তুলনায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে কিছুটা কম থাকলেও, সন্ত্রাসমুক্ত হতে পারেনি রাজ্য।

এ বছরও বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক খুন-জখম-হানাহানি নিয়ে কমবেশি প্রায়
সবাই সন্ত্রস্ত ছিলাম। কিন্তু বহু বছর পরে এমন একটি নির্বাচন আমরা পার করলাম, যেখানে খুন-জখম তো অনেক পরের ব্যাপার,
সে ভাবে গণ্ডগোলও হয়নি। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রত্যেক বৈধ ভোটার ভোট দিয়েছেন। নিজে ভোটকর্মী হিসেবে দেখেছি, দলে দলে মানুষ এসেছেন তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে। সম্পূর্ণ হিংসামুক্ত পরিবেশ উপহার দেওয়ার জন্য কৃতিত্ব অবশ্যই প্রাপ্য নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর।

এই কৃতিত্ব কিন্তু অনেকটা ম্লান হয়ে যেতে পারে যদি ফলপ্রকাশের পরে নতুন করে শুরু হওয়া হিংসা বন্ধ না করা যায়। কারণ, বেশ কিছু জায়গা থেকে ইতিমধ্যেই সে রকম খবর আসতে শুরু করেছে। অগ্নিসংযোগ, শারীরিক হেনস্থার পাশাপাশি অনেককে বাড়ি ছাড়তেও বাধ্য করা হচ্ছে। কাউকে আবার ক্ষমা চাইতেও বাধ্য করা হচ্ছে।

কিন্তু এ সব কি অপ্রত্যাশিত ছিল?

সম্ভবত নয়। গত কয়েক বছর ধরে এই রাজ্যের হাল ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছিল। রাজনৈতিক দেউলিয়াপনায় ভুগে অকথা-কুকথার বাক্যবাণে দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও বিদ্ধ করা হয়েছিল। খোলা মঞ্চ থেকে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে ‘ডিজে’
বাজানোর প্রচ্ছন্ন হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন তথাকথিত প্রথম সারির নেতারা। যদি ২০২১ সালের নির্বাচনের পরবর্তী সময় ধরি, তবে তখনও শাসক দলের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে, নিজের বাড়ি ছেড়ে বহু মানুষকে আশ্রয় নিতে
হয়েছিল পাশের রাজ্যে। অনেকে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে পার্টি অফিসে এসেও থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। একের পর এক নির্বাচনে ভোট দিতে না দেওয়া বা ভোট দিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছিল। সঙ্গে ছিল ধমকানো চমকানো। সম্ভবত আজ সে সবই ফিরিয়ে দিচ্ছেন অনেকে।

কিন্তু এই অবস্থা কখনও মানা যায় না। ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, ‘বদলা নয়, বদলাও’ হবে নতুন
সরকারের পাখির চোখ। আর সেই ‘বদল’-এর অতি অবশ্যই নির্বাচন পরবর্তী সন্ত্রাস কোনও জায়গা পেতে পারে না। উৎসাহের আতিশয্যে যাঁরা আজ হানাহানির পথ বেছে নিচ্ছেন, তাঁরা কখনই কোনও সভ্য রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারেন না। তাঁরা নিতান্তই দুষ্কৃতী। ফলে প্রশাসনের উচিত, অবিলম্বে তাঁদের আটক করে শাস্তি দেওয়া।

ভুললে চলবে না যে, শ্রীচৈতন্যদেব থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মনীষীদের এই রাজ্য চিরদিন অহিংসার কথা বলে এসেছে, প্রেমের জয়গান গেয়েছে, সমগ্র দেশকে পথ দেখিয়েছে। কতিপয় দুর্বৃত্তের জন্য আমরা রাজ্যের সুনাম নিলাম করতে পারি না। নবগঠিত সরকারের সামনে এখন সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শিক্ষক, কোচবিহার

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

North Bengal BJP TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy