১৯৭১ থেকে ২০২৫ সাল। গত ৫৪ বছরে কখনও এক বছর অন্তর, কখনও দু’বছর পর দার্জিলিং ছুটে যান তাঁরা। তাঁদের কাছে শীতে পশ্চিমবঙ্গের শৈল শহরের নৈসর্গিক দৃশ্যের আকর্ষণই আলাদা। কিন্তু তাঁদের আসল টান পাহাড়ের খেলনা গাড়ি!
ধোঁয়া ওঠা ইঞ্জিনের টানে বার বার জাপানের একদল মানুষ ফিরে আসেন পাহাড়ের কোলে। প্রায়শই বছরের শুরুতে জাপান থেকে বুকিং পায় দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (ডিএইচআর)৷ ‘রীতি মেনে’ ২০২৬ সালের গোড়াতেও ফের দার্জিলিঙে ওই জাপানি পর্যটকেরা।
সম্প্রতি এনজেপি স্টেশন থেকে চাটার্ড ট্রেন ভাড়া করেছিল বিদেশি পর্যটকদের ওই দলটি। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে তাঁদের কেউ সেই ট্রেনে ওঠেননি। আবার গোটা যাত্রাপথ টয়ট্রেনে চেপেও গেলেন না৷ ডিজেল ইঞ্জিন নয়, কয়লাচালিত বাষ্প ইঞ্জিনই চাই তাঁদের। শেষে তা-ই হল। কয়লা ঢেলে ট্রেনের হুইস্ল বাজতেই উৎসাহের অন্ত নেই বৃদ্ধ পর্যটকদের৷ পাহাড়ি রেলপথে কী ভাবে এঁকেবেঁকে টয়ট্রেন ছুটছে, সে দিকে তাকিয়ে সকলেই ‘বিস্ময় বালক।’ গোটা যাত্রাপথে স্টিম ইঞ্জিনের নস্টালজিয়ার সঙ্গে পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ফ্রেমবন্দি করে গিয়েছেন জাপানি পর্যটকেরা।
ডিএইচআরের দাবি, জাপানের ওই পর্যটকের দলটি প্রতি দুই বা এক বছর অন্তর নিয়ম করে দার্জিলিঙে আসেন শুধুমাত্র টয়ট্রেনের আকর্ষণে। কয়লাচালিত স্টিম ইঞ্জিনের প্রতি তাদের বাড়তি আগ্রহ। স্টিম ইঞ্জিনটি কু-ঝিকঝিক হুইস্ল বাজিয়ে টয়ট্রেন যাত্রার প্রস্তুতি নিতেই জাপানি পর্যটকদের উচ্ছ্বাসের অন্ত নেই। এনজেপি থেকে সুকনা, রংটং এবং তিনধারিয়া হয়ে আঁকাবাঁকা পাহাড়িপথে কার্শিয়াং পৌঁছনো পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথ তাঁরা ক্যামেরাবন্দি করেছেন।
আরও পড়ুন:
মজার ব্যাপার জাপানের এই পর্যটকদের দলে প্রতি বছর কিছু নতুন মুখ যোগ দেন৷ কিন্তু সকলেই বয়স্ক। সকলের গলাতেই ঝোলে ক্যামেরা৷ ট্রেনের হুইস্ল বাজতেই শুরু হয় পটাপট শাটারের শব্দ। জাপানি পর্যটকদের জন্য এ বার বিশেষ ব্যবস্থা করেছে ডিএইচআর। মঙ্গলবার দুপুরে কার্শিয়াঙে পর্যটক দলটিকে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মেনুতে রয়েছে সমস্ত নেপালি পদ। জাপানি পর্যটকদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা জানতেই এই আয়োজন। রেলের এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘জাপান থেকে নিয়মিত এঁরা পাহাড় বেড়াতে আসেন। প্রতি বারই টয়ট্রেন ভাড়া করেন। নিজেদের দেশে ফিরে ডিএইচআর নিয়ে প্রচারও করেন। তাই রেল কর্তৃপক্ষও তাঁদের জন্য একটি আয়োজন করেছে।’’ ডিএইচআর-এর ডিরেক্টর ঋষভ চৌধুরী বলেন, ‘‘এই দলটি টয়ট্রেন দেখতে প্রচণ্ড ভালবাসেন৷ কী ভাবে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে ট্রেন ছুটে চলে, তা-ই উপভোগ করেন তাঁরা৷ প্রতি বার নতুন নতুন মুখ থাকে। সেই ৭১ সাল থেকে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের সঙ্গে এই পর্যটকদের সম্পর্ক।’’
জাপানি পর্যটক দলে রয়েছেন টোকিয়োর বাসিন্দা সিইয়া সুগাওয়ারা৷ এ নিয়ে ৩৬ বার টয়ট্রেন দেখতে ভারতে এসেছেন ৮৪ বছরের এই বৃদ্ধ। এ বার ছয় বন্ধুকেও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন তিনি। সিইয়ার কথায়, ‘‘বয়স হয়েছে। এ বারের দার্জিলিং সফরই হয়তো আমার শেষ সফর। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের আতিথেয়তায় সআমরা মুগ্ধ। বেঁচে থাকলে আবার পরের বছরের শুরুতে দার্জিলিং আসব।’’