জাতীয় সড়কের ধারে বাড়ি। মাঝরাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সেখানেই ঢুকে পড়ল কয়লা বোঝাই লরি। চাপা পড়ে মৃত্যু হল এক যুবকের।
এরই জেরে উত্তাল হয়ে উঠল জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ি৷ বৃহস্পতিবার গভীর রাতের ওই দুর্ঘটনার পরে পুলিশ ও দমকলের দু’টি গাড়ি ভাঙচুর করে জনতা। লরিটিকেও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে উত্তেজিত জনতা৷ এমনকি দুই পুলিশ কর্মীর গায়ে কেরোসিন তেলও ছিটিয়ে দেওয়া হয়৷ ময়নাগুড়ি, জলপাইগুড়ির বিভিন্ন থানা থেকে পুলিশ কর্মীরা গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে৷
পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাত একটা নাগাদ ময়নাগুড়ির স্কুল শহিদগড় পাড়ায় ৩১নম্বর জাতীয় সড়কের ঠিক পাশেই বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন রাজু রায়(২৪) নামের ওই যুবক৷ অসমে এসি মেশিনের কাজ করতেন তিনি। পৌষ সংক্রান্তির দিন বাড়িতে এসেছিলেন৷ এ দিনই তার অসম ফিরে যাওয়ার কথা ছিল৷ তার আগে বৃহস্পতিবার রাতে বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকও করেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রের খবর, অসম থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার পথে কয়লা বোঝাই লরিটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ওই বাড়িতে একেবারে রাজুর ঘরে ঢুকে যায়। এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, সঙ্গে সঙ্গে থানা ও দমকলে ফোন করেও কোনও লাভ হয়নি৷ বাধ্য হয়ে তারা যখন থানায় ছুটে যান তখন থানার গেটও বন্ধ ছিল। এতেই এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে৷ ইতিমধ্যেই পুলিশের হাইওয়ে পেট্রোলিং-এর একটি গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাদের ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়৷ অভিযোগ পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়া হয়৷ তারপর লরিটিতে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়৷ সেই সময় সেখানে উপস্থিত দুই পুলিশ কর্মীর গায়েও কেরোসিন তেল ছিটিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা৷ খবর পেয়ে প্রথমে ময়নাগুড়ি থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে ছুটে যায়৷ এর মাঝে একটি দমকলের গাড়ি সেখানে পৌঁছলে ক্ষুব্ধ জনতা কাঁচ ভাঙচুর করে৷
এরপর জলপাইগুড়ি, রাজগঞ্জ, নাগরাকাটা, মেটেলি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়৷ ঘটনাস্থলে যায় আলিপুরদুয়ার জেলার পুলিশও৷ নামানো হয় র্যাফ৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর লরির নীচে চাপা পড়ে থাকা রাজুর দেহ উদ্ধার করে জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালের মর্গে পাঠায় তারা৷ ভোরবেলা ক্রেন দিয়ে লরিটিকে বার করা হয়৷
গোলমালের আশঙ্কায় দিনভর বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন ছিল ময়নাগুড়িতে৷ জলপাইগুড়িতে ময়নাতদন্তের পর পুলিশি ঘেরাটোপে তার দেহ ময়নাগুড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়৷ সেখানেই তাঁর শেষকৃত্য হয়৷
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের সন্দেহ, হাইওয়ে পেট্রোলিং ভ্যান তোলা চাওয়াতেই লরিটি গতি বাড়িয়ে দেয় এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়ে৷ স্থানীয় বাসিন্দা বাবলু রায় বলেন, ‘‘ঘটনার পর বহু বার থানা ও দমকলে ফোন করা হলেও কোনও কাজ হয়নি৷ এমনকি থানায় গিয়ে দেখি গেট বন্ধ৷ সেখানকার পুলিশ কর্মীরা বিষয়টিকে কোন গুরুত্বই দিতে চাননি৷’’ এলাকার আরেক বাসিন্দা মন ঘোষ বলেন, ‘‘পুলিশ ও দমকল সঠিক সময়ে এসে রাজুকে উদ্ধারের চেষ্টা করলে হয়তো ওর প্রাণটা বেচে যেত৷’’
যদিও জলপাইগুড়ির পুলিশ কর্তারা অবশ্য সব অভিযোগই ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন৷ ময়নাগুড়ির দমকল আধিকারিক রঞ্জিত রায় বলেন, ‘‘বিএসএনএলের ল্যান্ড ফোন লাইন বসে যাওয়াতেই তাদের দূর্ঘটনার খবর পেতে দেরি হয়৷ তবে জলপাইগুড়ি দমকল কেন্দ্র মারফৎ খবর পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পৌঁছে যাই৷ এরপরই জনতা আমাদের একটি গাড়ি ভাঙচুর করে৷ তিনজন কর্মীকেও হেনস্থা করে৷’’
তবে জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি অবশ্য জানান, ঘটনায় কোনও পুলিশ কর্মী নিগৃহিত হননি৷ পুলিশের কোন গাড়িও ভাঙচুর হয়নি৷ দূর্ঘটনার পর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলার সাময়িক অবনতি হলেও এই মুহুর্তে পরিস্থিতি সম্পুর্ণ নিয়ন্ত্রণে৷’’
পুলিশের একাংশের সন্দেহ দুর্ঘটনা ঘিরে যে তাণ্ডব তার পিছনে বহিরাগতদের মদত থাকতে পারে৷ স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যে রাস্তায় দুর্ঘটনাটি হয় সেখানে চার লেনের রাস্তা হবে৷ কিন্তু সরকারি জমিতে বসবাস করায় জমির দাম পাওয়া যাবে না বলে অনেকের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে৷ পুলিশের কোনও কোনও কর্তার ধারণা, দূর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বহিরাগত কেউ বা কারা এ ধরণের কিছু মানুষকে উস্কে দিয়েই উত্তেজনা ছড়িয়েছে৷