তিন মাস আগে গত নভেম্বরে পূর্ব হিমালয়ে ভূমিকম্প-প্রবণতার চরিত্র বদলে গিয়েছে। তার পরে উত্তরবঙ্গ এবং সিকিমে পরপর কিছু ভূমিকম্পের জেরে আরও বড় কম্পনের আশঙ্কা বেড়েছে বলে জানাচ্ছেন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের দাবি, সাম্প্রতিক ভূকম্পগুলির কোনওটি মূল কম্পনের ‘আফটার শক’ নয়। বরং খুব দ্রুত এবং পরপর ঘটে যাওয়া একাধিক ভূমিকম্প (সোয়ার্ম অফ আর্থকোয়েক)।
দেশের অন্যতম ভূকম্প বিশেষজ্ঞ তথা বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শঙ্করকুমার নাথ সিকিমের ওই ভূমিকম্পের পরে জানান, এলাকায় ‘থ্রাস্ট ফল্ট’ বা পুরনো পাথরের উপরে নতুন পাথরের চাপ বেড়েছে। এখনই সজাগ, সচেতন হতে হবে। নির্মাণ-কাজে আরও সচেতন হতে হবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত ২৫ বছর ধরে পূর্ব হিমালয়ে ভূমিকম্প নিয়ে কাজ করছেন শঙ্করবাবু।
আইআইটি খড়্গপুরের এই প্রাক্তন বিজ্ঞানীর ভূমিকা ভূমিকম্পের নতুন ‘জ়োন ম্যাপ’ তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে। সম্প্রতি ব্যুরো অফ ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড ওই মানচিত্র প্রকাশ করে। শঙ্করকুমার এই দিন বলেন, ‘‘সিকিমের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের চরিত্র নিয়ে চিন্তা বাড়ছে। পরপর এ রকম ভূমিকম্প হলে তার পরে একটি বড় ধাক্কার আশঙ্কা থাকে।’’ তিনি আরও জানান, ১৯৯৭ সাল থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ এবং পরে কেন্দ্রীয় ভূ-বিজ্ঞান মন্ত্রকের উদ্যেগে সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গে কয়েকটি অ্যাক্সিলারো মিটার বা ভূমিকম্প-মাপক যন্ত্র বসানো হয়। সেগুলি থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, সিকিম এবং উত্তর দিনাজপুরের দার্জিলিং লাগোয়া কিছুটা এলাকা এখন ভূমিকম্পের ছয় নম্বর জ়োনে (সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ) চলে গিয়েছে। নতুন মানচিত্র অনুযায়ী, উত্তর দিনাজপুরের বাকি অংশ, মালদহ এবং দক্ষিণ দিনাজপুর বর্তমানে পাঁচ নম্বর জ়োনে (উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ) গিয়েছে। উত্তরবঙ্গে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা দার্জিলিং ও কালিম্পংকে ঘিরেই।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ছয় নম্বর জ়োন এলাকায় ভূমিকম্প রিখটার স্কেলে ৮.৩ পর্যন্ত তীব্র মাত্রার হতে পারে। পূর্ব হিমালয়ে ৮.১ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। এই প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তথা ভূতত্ত্ববিদ প্রদীপ সামন্ত বলেন, ‘‘এই পুরো এলাকায় ওসিয়ানিক প্লেট এবং কনটিনেন্টাল প্লেট রয়েছে। ওসিয়ানিক প্লেটগুলি কনটিনেন্টাল প্লেটগুলিকে ক্রমাগত নাড়াচ্ছে বলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।’’
সিকিম বা এই এলাকার লাগোয়া উত্তরবঙ্গে ভূমিকম্প থেমে নেই। পর পর একই অঞ্চলে একাধিক ভূমিকম্প হয়ে চলেছে। প্রায় এক সপ্তাহে অন্তত ৩৯টি ভূমিকম্প ওই এলাকায় হয়েছে বলে এই দিন জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক গোপীনাথ রাহা। নতুন মানচিত্র অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গ এবং সিকিমে এখন থেকে বহুতল নির্মাণের ক্ষেত্রে আরও নিরাপদ নির্মাণ কোড মেনে চলতে হবে। ২০২৩ সালে উত্তরাখণ্ডের যোশীমঠ শহরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অনেকগুলি কারণের মধ্যে বিজ্ঞানীরা প্রচুর বহুতল ও ভূমিকম্পকেও চিহ্নিত করেছিলেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)