তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সমর্থকদের হাতে হেনস্থার অভিযোগ তুলে পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন বালুরঘাটের আইন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দুর্জয় দেব। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সরকারি আইনজীবী সুভাষ চাকির ছেলে শাশ্বত চাকির নেতৃত্বে একদল টিএমসিপি সমর্থক তাঁর মুখে ঘুষিও মেরেছে বলে অভিযোগ দুর্জয়বাবুর। কিন্তু পুলিশের কাছে শাশ্বতবাবুর নাম করে অভিযোগ করার পরেও বালুরঘাট থানা এই বিষয়ে শুধু একটি জেনারেল ডায়েরি করেছে। কেন পুলিশ এফআইআর করল না? বালুরঘাট থানার আইসি বিপুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘ঘটনার যে ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গিয়েছে, তাতে দুর্জয়বাবুকে মারধর বা ভাঙচুরের প্রমাণ মেলেনি। তাই জেনারেল ডায়েরিই করা হয়েছে।’’
শিক্ষাঙ্গনে নৈরাজ্যের জেরে সম্প্রতি কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রতনলাল হাংলু ও আলিপুরদুয়ার কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শৈলেন দেবনাথ পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। তারপরে ফের বালুরঘাট আইন কলেজে এই ধরনের অভিযোগ ওঠায় বিব্রত তৃণমূল। তবে বালুরঘাট কলেজের ঘটনার মধ্যে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের ছায়া দেখতে পাচ্ছেন বিরোধীরা। স্থানীয় সূত্রেও জানা গিয়েছে, দুর্জয়বাবু জেলা তৃণমূলের সভাপতি বিপ্লব মিত্রের ঘনিষ্ঠ। বিপ্লববাবু এই কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতি। সুভাষবাবু জেলার বিধায়ক তথা পূর্তমন্ত্রী শঙ্কর চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ। সুভাষবাবুও এই কলেজের পরিচালন সমিতির সদস্য। সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য হীরেন সাহার অভিযোগ, ‘‘জেলা তৃণমূলে বিপ্লববাবু ও শঙ্করবাবুর অনুগামীদের লড়াই অনেক দিনের। সেই লড়াইয়ের জেরেই ওই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে সরকারি আইনজীবীর ছেলের গোলমাল হয়েছে। কিন্তু এর ফলে কলেজের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে।’’
সেই সঙ্গেই হীরেনবাবুর অভিযোগ, ‘‘পুলিশও কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তাই জেনারেল ডায়েরির বেশি কিছু করতে চাইছে না।’’ আইসি বিপুলবাবু অবশ্য বলেন, ‘‘তদন্তে যদি দেখা যায়, সত্যিই গুরুতর কিছু হয়েছে, তা হলে অবশ্যই এফআইআর করা হবে।’’
কলেজে গণ্ডগোলের সূত্রপাত মঙ্গলবার থেকে। কলেজের ছাত্র সংসদ টিএমসিপির হাতে। সে দিন তাদের ঘরে ভাঙচুর করা হয়। অভিযোগের তির ছিল শাশ্বতবাবুদের দিকে। শাশ্বতবাবুর দাবি, টিএমসিপির বিরুদ্ধ গোষ্ঠী তাঁকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসিয়ে দিতে চাইছে। দুর্জয়বাবু কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতী কলেজে ঢুকে ভাঙচুর করেছে বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। কিন্তু কলেজে রটে যায়, ঘটনার পিছনে শাশ্বতবাবুদেরই হাত রয়েছে। বৃহস্পতিবার সেই ব্যাপারেই শাশ্বতবাবু ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গী দুর্জয়বাবুর কাছে স্মারকলিপি দিতে গিয়েছিলেন। দুর্জয়বাবুর অভিযোগ, ‘‘ওই ছাত্রেরা আমার ঘরে ঢুকে দাবি করতে থাকে, বৈদ্যুতিন সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের সামনে আমাকে স্বীকার করতে হবে যে, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। তারা যে নির্দোষ, তা থানার আইসিকে ফোন করে বলার জন্যও চাপ দিতে থাকে। তারপরে গালাগালি করে। টেবিল ভাঙে। আমার মুখে ঘুষিও মারা হয়।’’ দুর্জয়বাবু বলেন, ‘‘এরকম চলতে থাকলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ থেকে সরে যাব।’’ শাশ্বতর দাবি, ‘‘ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে তর্কাতর্কি হয়েছে মাত্র। মারামারি বা ভাঙচুরের অভিযোগ মিথ্যা।’’ সুভাষবাবুরও দাবি, ‘‘আমার ও মন্ত্রীর বদনাম রটাতে ছেলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।’’ তাঁর দাবি, সম্প্রতি দুর্জয়বাবুর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও উঠেছিল। দুর্জয়বাবু অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, বিপ্লববাবুর পরামর্শেই তিনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন।
বিপ্লববাবুর বক্তব্য, ‘‘পুলিশ অবশ্যই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।’’ আর মন্ত্রী শঙ্করবাবু বলেন, ‘‘দীর্ঘ দিন ধরে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছু ছাত্রের বিবাদ চলছে বলে শুনেছি। পুলিশ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিক।’’