উত্তরের নাটক বাঁচবে প্রত্যয়ে প্রতিনিয়ত
‘আমাদের ডিসিপ্লিন নেই, আমরা নাট্যজগতের সন্দেহজনক অনুপ্রবেশকারী।’ এক শীতের সন্ধ্যায় এ ভাবেই নিজেদের অবস্থা ও অবস্থান স্পষ্ট করল বালুরঘাট নাট্যকর্মীর অমিতদা। কী নাটক, কেন নাটক বিতর্কের মাঝেও এই পারফর্মিং আর্টের শুধু ধারাভাষ্য নয়, বালুরঘাট নাট্য ঐতিহ্যের সাম্প্রতিক হালচাল এক লহমায় শোনা গেল। তাই এখনও বিশ্ব পুঁজির বাজারে যাঁরা নাটকে আইটেম বানাতে চাইছেন তাঁদেরও গ্রিনরুমে প্রবেশ নিষিদ্ধ! কেন না এটা তো আর আরোপিত আর্ট নয়। একটা তাগিদ, কিছুটা প্রত্যয় আর বাকিটা জুড়ে থাকে ভাললাগা-ভালবাসা। তাই নাটকের জন্য যতই দিকে দিকে মেলা চলুক, নাট্যকার নিয়ে পুনর্মিলন সমাবেশ হোক না কেন, এই ভুবনায়নের মাঝে নাটকও সময়ে অসময়ে অনেকটা সিনেমা হয়ে যাচ্ছে। একটা অভিশপ্ত ওভারল্যাপিং নাটকটাকে বলিউডের কৃষ্ণগহ্বরে প্রবেশ করানোয় অস্থির। তাই নাটকে প্রজেক্টরের ব্যবহার যদি উত্তর আধুনিকতার বিজ্ঞাপন হয়, প্রথম শ্রেণির ডলবি স্টুডিওর আবহ যদি দর্শকের মনে হ্যামারের হাতিয়ার হয়, তবে টিনের তলোয়ার, ফেরারি ফৌজ, সূর্যশিকার, বিছন, দেবাংশী বা জল কী ভাবে দাগ কেটেছিল?বিতর্ক বাড়লেও সূর্যাস্তের পর সবাই মিলে বলেছিল এটাই নাকি নাটকের উদারীকরণ। বিশ্ব বাজারে নাটককে কমোডিটি না করতে পারলে নাকি এ শিল্পের ভ্রূণ অঙ্কুরের আগেই মৃত্যু ছোঁবে—কারা যেন দিন দিন এই স্টেটমেন্ট ইনজেক্ট করে গেল সবার মনে। তারা আরও বলেছিল, এ সব মশলা ছাড়া নাকি নাটকই অচল। তাই চিন্তাভাবনার বদলে যদি কনসেপ্টই বদলে যায়, তবে আর কীসের নাটক? সিনে-ড্রামা বলাই শ্রেয়! আমরা দল বেঁধে স্বপ্ন দেখব, বিরতির পর ডিজিটাইসড কুশীলব হাউসফুল কলাকেন্দ্র থেকে দীনবন্ধু মঞ্চ। অথচ এত কিছুর পরও আমাদের ডেজিগনেশন বদলায়নি। আমরা দর্শকই থেকে গেলাম। নাটকের জন্য হাঁটলাম, নাট্যকারকে হামলার প্রতিবাদে কাঁদলাম, বড় দল এনে শহরের মন জুড়োলাম, দায়িত্ব শেষ। মনে মনে সবাই ভাবছে নাটক বাঁচিয়ে কী হবে? সে তো পরম আত্মীয় নয়! অহেতুক ফিমেল চরিত্রের খোঁজে গার্জিয়ানের কাছে দিবারাত্র দরবার। কেন না আজও বোধহয় ডুয়ার্স থেকে পতিরাম বা মালবাজার টু দিনহাটায় এ ধারণার বদল আসেনি যে থিয়েটার মানেই সময় নষ্ট! অভিভাবকের বদ্ধমূল বিশ্বাস, এখানেই নাকি প্রতিনিয়ত পদস্খলনের ভয়! অথচ তারা আজও জানে না থিয়েটার থেরাপির কথা। সমাজে নামতে নামতে যখন অবনমনও মুখ ঘোরায়, সেখান থেকেই নাইজেলকে তুলে নাট্যবাসর সাজিয়েছিলেন অলকানন্দাদি। তাই বাল্মীকি প্রতিভা আজও ইতিহাস। ওর চালানো পথে আজ জলপাইগুড়ির সংশোধনাগারেও সাবলীল সংলাপ। ঠিকঠাক আলো নিতে অবস্থান বদলায় খুনের আসামি। এক সময় চণ্ডালের রাগও জল হয় মঞ্চের দাপটে। আমরা বুঝলাম কই? তাই আজও আদর্শ পথনাটকের স্রষ্টা সফদার হাসমির মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে। তিনি নাটকের স্বার্থে শেষ দিন পর্যন্ত হৃদয় নামক আগ্নেয়াস্ত্রকে সারেন্ডার করেননি জনসমক্ষে। তাই বর্তমানে উত্তর বাংলার বিভিন্ন নাট্যদলে যদি ফান্ডের অভাবে বন্ধ কারখানার মতো লক-আউট জারি হয়, তবে সেটা আর লজ্জা নয়, এক ধরনের সামাজিক ক্রাইম। রাষ্ট্রের কাছে জবাব চাইবার সময় এসেছে বন্ধু। রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় স্বাচ্ছন্দ্যে থিয়েটারও যে একটা ফ্যাক্টর হতে পারে, শতাব্দী শেষের বিচ্ছিন্ন রায়ট তার প্রমাণ দিয়েছিল। চা-বাগান, গোর্খা আন্দোলন থেকে কামতাপুরী আন্দোলনের যথার্থতা নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে দিতে পারত থিয়েটার। হয়নি! নকশাল আন্দোলন কতটা প্রাসঙ্গিক এ প্রজন্মের কাছে, শত প্রশ্নের পরও শুধু নীরবতার উপহাস জুটেছিল নির্দেশকের কাছে। এমনকী যে শহরে একশো মিটার ব্যাসার্ধে তিনটি মঞ্চের অবস্থান, সেখানেও নতুন নাটক হরতাল ঘোষণা করেছে। পুরনো শো দিয়েই চলছে অধিকাংশ দলের নাট্য আন্দোলন। এর মাঝেও কলাকুশলী ও নাট্যকর্মীর স্রোত অন্য রকম প্রমাণের চেষ্টা করছে। উত্তরের সিটি অব থিয়েটার বালুরঘাটেই যেন চলছে নাট্যবিদ্রোহ। তাই মাঝে মাঝে গর্ব হয়। জানি, থিয়েটারের লেসন প্ল্যান নেই। তবুও এই আর্টকে কমবয়সিদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে উত্তর জুড়ে চলছে ইন্টারস্কুল ড্রামা ফেস্ট। পথ দেখাচ্ছে নাট্যগোষ্ঠীর সৈনিকরা। শুধু উদ্যোগে সততা দরকার। অসহিষ্ণুতা থেকে সন্ত্রাস, কামদুনি থেকে ওয়াল মার্ট, অজয় থেকে আত্রেয়ীকে এক সরলরেখায় মিলিয়ে দিতে পারে নাটক, যেখানে রিটেক অসম্ভব। তাই উত্তর বাংলার নাটককে কলকাতার নাটকের অনুসরণ করতেই হবে, এ ধারণাকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। শুধু বুঝতে হবে সময়ের ভাষা। —সন্দীপন নন্দী, বালুরঘাট।