নামটা দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে হলেও ‘টয় ট্রেন’-এর পথ চলা শুরু কিন্তু শিলিগুড়ি থেকেই। শিলিগুড়ি টাউন স্টেশনের নাম ঘুরেফিরে কত লেখায় না উঠে এসেছে। সেই টয় ট্রেনকে ঘিরে এনজেপি থেকে রংটং পর্যন্ত জয় রাইডের সংখ্যা বাড়ানোর পক্ষপাতি পর্য়টন মহল। বিশেষত, ছুটির দিনগুলিতে ‘জয় রাইড’ বাড়িয়ে দিলে শিলিগুড়ি শহরকে ঘিরে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে। শিলিগুড়ি জংশন এলাকায় রেলের একটি মিউজিয়ম করার দাবিও রয়েছে। যেখানে ইংরেজ আমলের টয় ট্রেনের ইঞ্জিন থেকে নানা সরঞ্জামের প্রদর্শনী থাকতে পারে।
আবার নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন এলাকায় এখনও প্রচুর ফাঁকা জায়গা রয়েছে। সেখানে রেলের সঙ্গে যৌত উদ্যোগে গড়ে উঠতে পারে অতিথি নিবাস। পুরীতে যেমন রেলের সুদৃশ্য অতিথি নিবাস থাকতে পারে তা হলে শিলিগুড়িতে কেন নয়? এই প্রশ্ন তুলেছেন পর্য়টন মহলের অনেকেই। কারণ, দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ঢল নামে এনজেপিতেও। এনজেপি স্টেশন লাগোয়া বিস্তীর্ণ এলাকায় যৌথ উদ্যোগে মনোরম রিসর্ট গড়ে তোলার ব্যাপারেও কেন্দ্রের কাছে আর্জি জানানো জরুরি বলে মনে করেন বিদ্বজ্জনদের অনেকেই। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজ, নর্থ বেঙ্গলের অন্যম কর্তা নরেশ অগ্রবাল মনে করেন, এনজেপি, শিলিগুড়ি টাউন স্টেশন ও শিলিগুড়ি জংশন, তিনটি স্টেশন লাগোয়া এলাকায় পতিত জমির উপযুক্ত ব্যবহার করে পর্যটক টানার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। নরেশবাবু বলেন, ‘‘শিলিগুড়ির উপর দিয়ে যাতায়াত করেন হাজার-হাজার পর্যটক। এই শহরে যদি সাজানো-গোছানো থাকার জায়গা, বেড়ানোর মতো বন্দোবস্ত হয় তা হলে এখানেও থাকবেন। পর্য়টনের প্রসার হবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। এলাকার অর্থনীতির ভিত আরও শক্ত হবে।’’
ইস্কনের মন্দির।
বস্তুত, শিলিগড়িতে ‘রেলওয়ে হেরিটেজ সিটি’ হিসেবে গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন পর্যটন প্রসারে যুক্ত ব্যবসায়ীদের অনেকেই। ইস্টার্ন হিমালয়ান ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সভাপতি সম্রাট সান্যাল বলেন, ‘‘শিলিগুড়ির টয় ট্রেন ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বলেই সম্ভাবনা অনেক। শিলিগুড়িকে রেলওয়ে হেরিটেজ সিটি হিসেবে ঘোষণা করলে সেই সুবাদে অনেক পরিবর্তন হবে। যা কি না শহরের সামগ্রিক চেহারা পাল্টে দিতে পারে।’’ সম্রাটবাবু জানান, শিলিগুড়িতে আন্তর্জাতিক স্তরের কনভেনশনের আয়োজন বাড়ানোর উপরে বিশিষ্ট জনদের জোর দিতে হবে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেও আন্তর্জাতিক স্তরের আলোসভা আয়োজনের ব্যাপারে ভাবতে হবে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কথায়, ‘‘শিলিগুড়ির যা আবহাওয়া তাতে সারা বছর নানা ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের প্রদর্শনী, কর্মশালার আয়োজন হতে পারে। তা হলে এমনিতেই শিলিগুড়ি হয়ে উঠবে দেশ-বিদেশের অনেকেরই গন্তব্য।’’
শহরের খুব কাছেই রয়েছে ফুলবাড়ির জলাধার। নানা সময়ে ফুলবাড়ি জলাধারকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ার কথা সরকারি তরফে ঘোষণা হলেও কাজের কাজ হয়নি বলে এলাকাবাসীর মধ্যেই হতাশা ক্ষোভ দানা বাঁধছে। ফুলবাড়ি থেকে তিস্তা ক্যানাল ধরে গজলডোবার দিকে এগোলে দু’ধারে বনাঞ্চল। যে কোনও ঋতুতে ওই পথে যাতায়াতই উপভোগ্য। শিলিগুড়ি শহর থেকে আধ ঘণ্টার মধ্যে গিয়ে ফিরে আসা যায়। তবে ওই রুটে বেশ কিছু সুলভ শৌচালয়, পরিচ্ছন্ন রিসর্ট হওয়া জরুরি।
শিলিগুড়ি শহরের পুর এলাকার পরিষেবার দায়িত্বে রয়েছে পুরসভা অর্থাৎ শিলিগুড়ি কর্পোরেশন। লাগোয়া গ্রামাঞ্চলের উন্নয়ন দেখার জন্য রয়েছে শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ। শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ির বৃহৎ প্রকল্প রূপায়ণ ও পরিকল্পিত উন্নয়নের রূপরেখা তৈরির জন্য রয়েছে এসজেডিএ। তৃণমূল জমানায় তৈরি হওয়া উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের হাতেও রয়েছে অনেক দায়িত্ব। খোদ মুখ্যমন্ত্রীর উত্তরবঙ্গের সচিবালয় ‘উত্তরকন্যা’ও তৈরি হয়েছে শিলিগুড়ির গা ঘেঁষেই। তা সত্ত্বেও সুসংহত পরিকল্পনা করে শহর কেন এগোতে পারছে না সেটা নিয়ে কম বিতর্ক নেই। কার দোষ তা নিয়ে ঠেলাঠেলি, চাপাচাপিও যেন অন্তহীন। চাপানউতোর কাটিয়ে শেষ অবধি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে শিলিগুড়ি স্রেফ যাতায়াতের করিডরই থেকে যাবে না ‘গন্তব্য’ হয়ে উঠতে পারে কি না সেটাই দেখার।
—নিজস্ব চিত্র।
(চলবে)