দেওচড়াইয়ের গুলি-কাণ্ড নিয়ে এ বার শুরু হল রাজনৈতিক চাপানউতোর। শাসক তৃণমূল ঘটনার জন্য পুলিশের একাংশের পাশাপাশি সিপিএমের বিরুদ্ধে আগেই অভিযোগ তুলেছিল। সোমবার ঘটনার ব্যাপারে তৃণমূলের জেলা নেতৃত্বের ওই অভিযোগের সুর আরও চড়েছে। সিপিএমের তরফে তাদের দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়ে সিবিআই তদন্তের দাবি তোলা হয়েছে। ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছে ফব, বিজেপি ও কংগ্রেস।
তৃণমূলের অভিযোগ, পরিকল্পিত ভাবে দেওচড়াইয়ের সন্তোষপুর গ্রামে গোলমাল তৈরি করা হয়। এমনকী ওই অনুষ্ঠানের আগে খোদ তুফানগঞ্জ থানার অপসারিত ওসি এলাকার বাসিন্দা সিপিএমের প্রাক্তন বিধায়ক তমসের আলির বাড়িতে বৈঠক করেন। ওই প্রাক্তন বিধায়কই ফোন করে পুলিশকে মাইক বন্ধ করার কথা বলেছিলেন বলেও দাবি করেছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। তৃণমূলের কোচবিহার জেলা সভাপতি তথা নাটাবাড়ির বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, “দলীয় তদন্তে স্পষ্ট, রীতিমতো ছক কষে ওই গোলমালের পরিকল্পনা করা হয়। দেওচড়াইয়ের বাসিন্দা সিপিএমের প্রাক্তন বিধায়ক তমসের আলির বাড়িতে ঘটনার আগে তুফানগঞ্জ থানার অপসারিত ওসি মহিম অধিকারী বৈঠকও করেছিলেন। সমস্ত কিছুই দলের রাজ্য নেতৃত্বের মতো মুখ্যমন্ত্রীরও নজরে আনা হয়েছে।” মাইক বন্ধ করতে গিয়ে পুলিশ কেন অনুষ্ঠানস্থল থেকে দূরে ফাঁকা জায়গায় খালি গাড়ি রেখে যায় তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। সেইসঙ্গে রবীন্দ্রনাথবাবুর সংযোজন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী দু’দফায় ওই ঘটনার ব্যাপারে বিশদে খোঁজ নিয়েছেন। গুলিবিদ্ধদের পরিবারের প্রতি তিনি সমবেদনা জানিয়েছেন। আমরা ওই পরিবারের পাশে আছি। ভেস্তে যাওয়া অনুষ্ঠান নতুন করে আয়োজনের ব্যাপারেও এলাকার বাসিন্দা ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। সমস্ত সহযোগিতা করব।’’
অপসারিত ওসি মহিমবাবু দাবি করেছেন, তিনি সিপিএমের প্রাক্তন বিধায়ক তথা কোচবিহার জেলা সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য তমসের আলির বাড়িতে যাননি এবং তাঁর সঙ্গে কথাও বলেননি। ওসির বক্তব্য, ‘‘এ সব ঠিক নয়। প্রয়োজনে আমার মোবাইলের কল রেকর্ড দেখা হোক।’’ ওই অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন তমসের আলিও। তিনি বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোন পুলিশ অফিসার আমার বাড়িতে এসে বৈঠক করবেন এটা একেবারে ভিত্তিহীন কথা। তা হলে সেই অফিসারের চাকরি থাকত? তা ছাড়া আমি ফোন করে মাইক বন্ধের অভিযোগ জানাতেও যাইনি। তৃণমূল নিজেদের দোষ আড়াল করতে অপপ্রচার করে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে সিবিআই তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য জানা যাবে।”
বাম শরিক ফব তো বটেই কংগ্রেস, বিজেপিও ঘটনার তদন্তের দাবি তুলেছে। ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য অক্ষয় ঠাকুর বলেন, “সিপিএমের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা হচ্ছে। ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া দরকার।” বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য হেমচন্দ্র বর্মন বলেন, “আমরাও ওই ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত চাইছি।” কংগ্রেসের জেলা সভাপতি শ্যামল চৌধুরী বলেন, “রাজ্য জুড়ে পুলিশ পরপর আক্রান্ত হচ্ছে। কোচবিহারে কিছুদিন আগে একজন অফিসারের মৃত্যুও হয়েছে। তবে দেওচড়াইয়ে কে অন্যায় করেছে কে ঠিক কাজ করেছে তা তদন্ত হলেই বোঝা যাবে।”
শনিবার রাতে সন্তোষপুর গ্রামে অনুষ্ঠানে রাতভর মাইক বাজানোর অভিযোগ পেয়ে বন্ধ করতে যান তুফানগঞ্জ থানার পুলিশকর্মীরা। অভিযোগ, ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরিস্থিতির জেরে পুলিশের এক কমব্যাট জওয়ান গুলি চালালে পাঁচ গ্রামবাসী জখম হন। প্রশাসন সূত্রের খবর, জখমদের একজনকে ৫০ হাজার ও তিন জনকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে বলে কোচবিহারের জেলাশাসক পি উল্গানাথন বলেন, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক। পুলিশের নজরদারি রয়েছে।” কোচবিহারের এসপি সুনীল যাদবের মোবাইল বেজে গিয়েছে। রবিবার ঘটনার জেরে অপসারিত ওসি মহিম অধিকারীও মন্তব্য করতে চাননি। ঘনিষ্ঠমহলে তিনি অবশ্য সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে জানিয়েছেন। পুলিশের এক কর্তা অবশ্য বলেন, “আত্মরক্ষার প্রয়োজনে নিরুপায় হয়েই গুলি চালাতে হয়। তবে ভিড়ে ঠাসা অনুষ্ঠানে সেটা না হলেই ভাল হত। কী পরিস্থিতিতে কার নির্দেশে গুলি চালান হয় তা বিভাগীয় তদন্তের পর বোঝা যাবে।”