Advertisement
E-Paper

দলের অন্দরের দ্বন্দ্ব সামলানোই চ্যালেঞ্জ

ভোটের ময়দানে গৌতম দেব হারের হ্যাটট্রিক করার পরে তাঁকে দলের জেলা সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে বলে অনেক দিন ধরেই তৃণমূলের অন্দরে অনুমান করা হচ্ছিল। তা হলে কে তাঁর কুর্সিতে বসবেন, তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছিল। দলের প্রবীণদের মধ্যে অনেকে জেলা সভাপতি হওয়ার আশায় ছিলেন।

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০১৫ ০২:৩২
দার্জিলিং জেলা তৃণমূল সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন রঞ্জন সরকার। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

দার্জিলিং জেলা তৃণমূল সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পরে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করছেন রঞ্জন সরকার। ছবি: বিশ্বরূপ বসাক।

ভোটের ময়দানে গৌতম দেব হারের হ্যাটট্রিক করার পরে তাঁকে দলের জেলা সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে বলে অনেক দিন ধরেই তৃণমূলের অন্দরে অনুমান করা হচ্ছিল। তা হলে কে তাঁর কুর্সিতে বসবেন, তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছিল। দলের প্রবীণদের মধ্যে অনেকে জেলা সভাপতি হওয়ার আশায় ছিলেন। নবীনদের মধ্যেও কয়েকজনও ভেবেছিলেন, শিকে ছিঁড়তে পারে। কিন্তু তাঁদের টপকে এগিয়েছেন রঞ্জন সরকার ওরফে রানা। ফলে, দলের পদ প্রত্যাশীদের সামনে রানাকে এগোতে গিয়ে যে প্রতি পদে বাধার মুখে পড়তে হতে পারে, তা তৃণমূলের অনেকেই মানছেন। তাই দলের নয়া কমিটিতে প্রাথমিক ভাবে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামাল দেওয়ার একটা চেষ্টা হয়েছে বলে মনে করছেন তৃণমূলের প্রবীণ নেতারা।

যেমন, গৌতমবাবুকে চেয়ারম্যান করে কংগ্রেসের প্রাক্তন জেলা নেতা প্রশান্ত নন্দীকে উপদেষ্টা কমিটিতে রাখা হয়েছে। সেখানে প্রাক্তন দার্জিলিং জেলা সভাপতি প্রতুল চক্রবর্তীকেও রাখা হয়েছে। জ্যোৎস্না অগ্রবাল, জ্যোতি তির্কিদের রেখে মহিলা তৃণমূলের জেলার নেতৃত্বে আনা হয়েছে নতুন মুখ মমতা নন্দীকেও। সম্প্রতি কংগ্রেস থেকে আসা বিকাশ সরকারকে যুব সভাপতি করা হয়েছে। জেলার নেতৃত্বে আনা হয়েছে সঞ্জয় শর্মার মতো নতুন মুখকেও।

এতদসত্ত্বেও তৃণমূলের জেলা নেতাদের একাংশ মনে করছেন, রঞ্জনবাবুর কাছে চ্যালেঞ্জ হল, দলীয় রাজনীতিতে প্রবীণ তথা বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতাদের সামলানো। তা সামলে দলের ভাবমূর্তি ঠিক করার। দলের কয়েকজন প্রবীণ নেতার কথায়, ‘‘রঞ্জনকে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হবে। সমতলের প্রতিটি ব্লকে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব রয়েছে। শহরের নেতাদের ছড়াছড়ি। একে অন্যকে প্রায় প্রতিদিন তুলোধোনা করেন। পুরসভায় বহু পুরানো কাউন্সিলররা আছেন। অনেকে নতুন কমিটিতে জায়গা পেলেও বেশির ভাগ প্রথমে দিনের তালিকায় নাম ঢোকাতে পারেননি। সেখানে রানা কী করে পরিস্থিতি সামাল দেন, তাই এখন দেখার।’’

তৃণমূলের নতুন জেলা সভাপতি রঞ্জনবাবু অবশ্য নতুন দায়িত্ব পাওয়ার পর যথেষ্ট আশাবাদী। তাঁর কথায়, ‘‘দলনেত্রী আমার উপর যে ভরসা, আস্থা রেখেছেন তা পুরোপুরি পালন করব। গৌতমদা ছাড়াও সর্ব স্তরের নেতা-কর্মীদের নিয়ে আলোচনা করেই দলের কাজকর্ম করব। কিছু খামতি তো আমাদের আছেই, সেগুলির দিকে বেশি করে নজর দিতে হবে। রাজনীতিতে চ্যালেঞ্জ তো কিছু থাকবেই, আমরা সবাই মিলে উতরে যাব বলে আমি মনে করি।’’ সদ্য প্রাক্তন জেলা সভাপতি গৌতমবাবুও বলেছেন, ‘‘আমরা তো এত দিন সামলেছি। তরুণ প্রজন্মের তরুণ রক্তই আমাদের দরকার। রঞ্জন ভাল ছেলে। আমি মনে করি, ও খুব ভাল ভাবেই এই দায়িত্ব পালন করবে। আমরা তো পাশে আছি।’’

দলীয় সূত্রের খবর, প্রাক্তন জেলা সভাপতি গৌতমবাবু প্রায় ১১ বছর দায়িত্বে ছিলেন। প্রথম থেকেই দলের জেলায় একাধিক গোষ্ঠী তৈরিও হয়েছে। কংগ্রেস ছেড়ে এক সঙ্গে আসলেও কৃষ্ণ পাল, দীপক শীল, রঞ্জন শীলশর্মা, মদন ভট্টচার্য, বেদব্রত দত্তেরা প্রথম থেকেই তৃণমূল করলেও কোনওদিনই গৌতম অনুগামী বলে সেভাবে পরিচিত নন। তেমনই, নিজেরদের মধ্যেও তাঁদের খুব একটা সদ্ভাব রয়েছে, তা-ও বলা যায় না। আবার দলে নতুন আসা অলোক চক্রবর্তী বা নান্টু পালেরাও নিজেদের মতো করে দলের মধ্যে বৃত্ত তৈরি করেছেন। এক সময়কার দলের সভাপতি তথা প্রবীণ নেতা প্রতুল চক্রবর্তী বা প্রশান্ত নন্দীর সঙ্গে জেলার নেতাদের অনেকেরই সম্পর্কের কথাও দলের মধ্যে অজানা নয়।

সেখানে রাজনীতির একটা সময় গৌতমবাবুর কিছুটা ‘দূরের’ লোক হলেও সম্প্রতি রঞ্জনবাবু গৌতমবাবুর স্নেহধন্য বলেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। তবে তাঁর সঙ্গে দলের কয়েকজন প্রবীণ নেতাদের সম্পর্ক ভাল নয় বলে দল সূত্রে খবর। সেখানে ওই প্রবীণ এবং পোড়খাওয়া নেতাদের এক সঙ্গে কী ভাবে রঞ্জনবাবুর এবার সামলাবেন তা নিয়ে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই দলের মধ্যেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। তার উপরে সিপিএম, কংগ্রেস থেকে নতুন করে একদল নেতা তৃণমূলে আসার পর জেলা কমিটির শীর্ষ স্তরে পৌঁছে গেলেও নতুন কমিটিতে এবার তাঁরা এখনও কেউ ঠাঁই পাননি। উল্টে, পুরানো কয়েকজন নেতানেত্রীকে কমিটিতে আনা হয়েছে। যাঁদের অনেকের সঙ্গে রঞ্জনবাবুর দূরত্ব রয়েছে বলে তৃণমূলের নেতারাই জানিয়েছেন।

তৃণমূল নেতারা জানান, দলের এই গোষ্ঠী কোন্দলের প্রভাব পুরসভা, পঞ্চায়েত ভোটে পড়েছে। নিজের পছন্দের প্রার্থী, প্রচার, মনোনয়ন জমার কাগজপত্র তৈরিতেও এর প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি, মাটিগাড়া, নকশালবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া এবং খড়িবাড়ি ব্লকে একাধিক গোষ্ঠীর নেতাদের জেরে মহকুমা পরিষদের ভোটে দলের ফলেও তার প্রভাব পড়েছে। ব্লকে ব্লকে নেতারা নিজেদের মতো কাজ করেন। আবার গৌতমবাবুকে দলের সভাপতির পদ থেকে সরানোর প্রক্রিয়া শুরু হতেই সব চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, সদ্য পুরানো জেলা কমিটির কার্যকরী সভাপতি অলোক চক্রবর্তী এবং নান্টু পাল।

তৃণমূলের কয়েকজন নেতা জানান, দলের জেলার শীর্ষ এই দুই নেতা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি বিভিন্ন মহলে দরবারও শুরু করেছিলেন। শেষে পরিস্থিতি জটিলও হয়ে উঠেছিল, দলনেত্রীর উত্তরবঙ্গে এসে জয়ন্তী চলে গেলেও শিলিগুড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা তথা মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ‘স্টেট গেস্ট হাউসে’ বসে বিভিন্ন মহলে খোঁজখবর শুরু করেন। বিভিন্ন নেতাদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেন।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy