Advertisement
E-Paper

নদীর গ্রাসে ঠাঁই হারিয়ে বিপন্ন গ্রাম

একবার নয়, ঘর ভেঙেছে তিনবার। পিছিয়ে যেতে যেতে জমি-বাড়ির সবটুকু হারিয়ে গিয়েছে নদীগর্ভে। বয়স প্রায় আশি ছুঁইছুঁই। এক ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন। আরেক ছেলে চলে গিয়েছেন দিল্লিতে। মাজন বেওয়া আজ একা। ঠাঁই হয়েছে ত্রাণ শিবিরে। কখনও খাবার মেলে আবার কখনও মেলে না। সকাল হলেই নদীর খুব কাছে গিয়ে বসে থাকেন তিনি। তাকিয়ে থাকেন একদৃষ্টিতে।

নমিতেশ ঘোষ

শেষ আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০১:৫৯
দিনহাটায় ধরলা নদীর ভাঙন দেখতে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। ছবি: হিমাংশুরঞ্জন দেব।

দিনহাটায় ধরলা নদীর ভাঙন দেখতে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ। ছবি: হিমাংশুরঞ্জন দেব।

একবার নয়, ঘর ভেঙেছে তিনবার। পিছিয়ে যেতে যেতে জমি-বাড়ির সবটুকু হারিয়ে গিয়েছে নদীগর্ভে। বয়স প্রায় আশি ছুঁইছুঁই। এক ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন। আরেক ছেলে চলে গিয়েছেন দিল্লিতে। মাজন বেওয়া আজ একা। ঠাঁই হয়েছে ত্রাণ শিবিরে। কখনও খাবার মেলে আবার কখনও মেলে না। সকাল হলেই নদীর খুব কাছে গিয়ে বসে থাকেন তিনি। তাকিয়ে থাকেন একদৃষ্টিতে। বুধবার দুপুরে যখন বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ঘোষ সেই গ্রামে গেলেন, তাঁর হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন ওই বৃদ্ধা। বললেন, “এভাবে কি বেঁচে থাকা যায়?”

কোচবিহারের ওকরাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের পঞ্চধ্বজী গ্রামের ওই বৃদ্ধা একা নন, গোটা গ্রামটাই বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে এসে দাঁড়িয়েছে। যে প্রাথমিক স্কুলে ত্রাণশিবির রয়েছে নদী চলে এসেছে তারও দোরগোড়ায়। এ দিনও চারটি পরিবার তাঁদের ভিটেমাটি ছেড়ে নতুন জায়গায় উঠে গিয়েছেন। গত কয়েকদিনে ১২টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছেন। অন্তত ৫০০ বিঘা কৃষি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গিয়েছে।

রবীন্দ্রনাথবাবু বলেন, “ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিতে ইতিমধ্যে কয়েক দফায় বৈঠক হয়েছে। আবারও প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে আমি বিষয়টি নিয়ে কথা বলব। সেচ দফতরের সঙ্গেও কথা বলব। পরিকল্পনা তৈরি করে কাজ করা হবে।” সেই সঙ্গে তিনি ওই মহিলা-সহ যারা অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছেন তাঁদের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রশাসনের এক আধিকারিক অবশ্য বলেন, “নদী ভাঙন জেলার বহু জায়গাতেই ব্যাপক আকার নিয়েছে। সব জায়গায় বাঁধ নির্মাণ করা অসম্ভব ব্যাপার। যে সমস্ত জায়গায় বাঁধ নির্মাণ সম্ভব তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। পঞ্চধজীর বিষয়টিও দেখা হচ্ছে।”

Advertisement

কোচবিহার জেলায় নদী ভাঙনের ফলে কয়েক হাজার পরিবার বিপন্ন । বিশেষ করে নদীর চর এলাকায় গড়ে ওঠা গ্রামগুলির অবস্থা ভয়াবহ। তার বাইরেও অবশ্য বেশ কিছু এলাকায় নদীবাঁধ তৈরি না হওয়ার কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, গত এক সপ্তাহ অন্তত ১০০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছেন। তিন হাজার বিঘার বেশি জমি নদী গর্ভে চলে গিয়েছে। কোচবিহার শহর সংলগ্ন তোর্সা নদী চরেই ৬৫টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। সেখানে নদীর চরেই বসতি গড়ে উঠেছিল।

গীতালদহের দরিবস এলাকার অবস্থাও ভয়াবহ। সেখানে বহু মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন। প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ বিঘা জমি নদীগর্ভে চলে গিয়েছে। পেটলার সাবেক ছিটমহল বাত্রীগছে ভাঙন ব্যাপক আকার নিয়েছে। সেখানে ১০০ বিঘার উপরে জমি নদীগর্ভে গিয়েছে। ওই এলাকার বাসিন্দা রৌশন হোসেন বলেন, “৬৮ বছর ধরে আমরা কিছুই পাইনি। প্রতি বছর ভাঙনের মুখে পড়ে গ্রাম বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এ বারে অবস্থা খুব ভয়াবহ। ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আর্জি জানিয়েছি।”

তুফানগঞ্জের কৃষ্ণপুর সহ বেশ কিছু এলাকা ভাঙনে বিপর্জস্ত হয়ে পড়েছে। ওকরাবাড়ির ওই গ্রাম পঞ্চধজী ধরলা নদীর ভাঙনে বিপন্ন। ওই গ্রামের বাসিন্দা জনাব আলি, জহিরুল মিয়াঁ, রফিকুল মিয়াঁ সর্বেশ্বর বর্মনরা জানান, প্রতি বছর বর্ষার সময় নদীর জল বাড়ে। বর্ষার পরে নদীর জল কমে যায়। ওই দুই সময় ভাঙন ভয়াবহ আকার নেয়। বিঘার পর বিঘা জমি নদীতে চলে যায়।

সর্বেশ্বরবাবু বলেন, “একসময় অনেক জমি ছিল আমার। এখন কিছুই নেই। ওই ভিটেমাটি ছাড়া। কোনওরকমে সংসার চালাই। নদী ঘরের কাছে চলে এসেছে। আর হয়ত এক সপ্তাহ এখানে থাকত পারব। তার পরে কে জানে কোথায় যাব?”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy