Advertisement
E-Paper

পর্যটন মানচিত্রেও উঠে এসেছে কালীমন্দির

উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি কালীক্ষেত্র। এগুলি নিছক কালীমন্দির নয়। পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে উঠে এসেছে সেগুলি। পর্যটকরা ঘুরতে এসে নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি ঢুঁ মারেন মন্দিরগুলিতেও।

অনিতা দত্ত

শেষ আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৫ ০৩:১৯
শিলিগুড়ির অদূরে সেবক কালীবাড়ি। (ডান দিকে) কালিম্পং কালীবাড়ি। —নিজস্ব চিত্র।

শিলিগুড়ির অদূরে সেবক কালীবাড়ি। (ডান দিকে) কালিম্পং কালীবাড়ি। —নিজস্ব চিত্র।

উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সমতলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি কালীক্ষেত্র। এগুলি নিছক কালীমন্দির নয়। পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে উঠে এসেছে সেগুলি। পর্যটকরা ঘুরতে এসে নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি ঢুঁ মারেন মন্দিরগুলিতেও।

শিলিগুড়ি শহর ছাড়ালেই সেবক পাহাড়। এখানকার সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু সেবকেশ্বরী কালীমন্দির আর তার সৌন্দর্যসম্পদ চারপাশের অসাধারণ নিসর্গ। সেবক রোড ধরে ছুট লাগালেই শালুগড়া। জঙ্গল শেষ হলেই নজর কাড়ে তিস্তা পাড়ের সৌন্দর্য। দুই পাহাড়ের মধ্যে পান্না সবুজ জল বুকে নিয়ে বয়ে চলেছে। নদী ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়। নদীর ওপর রুপোলি রেল সেতু। এ সব দৃশ্য দেখতে দেখতে সেবক পাহাড়। ডান দিকে পাহাড়ে সেবকেশ্বরী কালীমন্দির। আনুমানিক ১৯৭২-এ মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়।

কালিম্পংয়ের সাড়ে আট মাইল এলাকায় রয়েছে কালিম্পংয়ের কালীমন্দিরটি। প্রতিষ্ঠাতা স্বামী জ্ঞানানন্দ তীর্থনাথ। প্রায় চার ফুট উচ্চতার কষ্টিপাথরের এই কালীমূর্তিটি তিনি তৈরি করে নিয়ে এসেছিলেন জয়পুর থেকে। মূর্তিটির পিছনে রয়েছে একটি চমকপ্রদ কাহিনি। ভারত-চিন যুদ্ধে অস্থিরতার কারণে বীরভূমের সুরুলে মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হন। সেখানে একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে। প্যাকিং বাক্স খোলা যায় না। অগত্যা কালিম্পংয়েই ফিরিয়ে আনলেন কালীমূর্তিটি। প্রথমে মন্দিরটি ছিল কাঠের দ্বিতল। ওপরে চলত পুজোপাঠ। নীচে বাস করতেন স্বামী জ্ঞানানন্দ। পাহাড়ের গায়ে হেলান দেওয়া বর্তমান পাকা মন্দিরটিতে রয়েছে অতিথি নিবাস। ভবতারিণীর রূপ দর্শনের জন্য ছুটে আসেন পর্যটকেরা। দীপান্বিতা কালীপুজোর রাতে সোনা ও রুপোর অলঙ্কারে সেজে ওঠে মাতৃমূর্তি।

প্রকৃতিকে উপভোগ করার পাশাপাশি পুণ্য অর্জনেরও সুযোগ পাওয়া যায় জলপাইগুড়ির বোদাগঞ্জ জঙ্গল মহলে। রয়েছে ভ্রামরীদেবীর মন্দির। মন্দির ঘিরে রয়েছে জনশ্রুতি আর গল্পকথা। ত্রিনয়নী দেবী ভ্রামরীর ছ’টি হাত। পদতলে মহাদেব। দেবীর বাম পদ এখানে পূজিত হয়। এটাই মন্দিরের বৈশিষ্ট্য। মন্দিরের খুব কাছেই তিস্তা নদীর বাঁধ। মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি জোড়া বটগাছ। স্থানীয় মানুষদের কাছে এটি অক্ষয় বট হিসেবে পরিচিত। ত্রিস্রোতার এই পীঠস্থানে মহালয়ার দিন তর্পণ করার রেওয়াজ রয়েছে। দেবী দর্শনের পাশাপাশি মন চাইলে প্রকৃতির মাঝে রাত্রিবাসেরও ব্যবস্থা রয়েছে। আরআইডিএফ (রুরাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফান্ড) প্রকল্পে বন দফতর তৈরি করে দিয়েছে পাঁচটি কটেজ। শাল সেগুনের ঘন জঙ্গলের মাঝে মন্দির হলে কী হবে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থী ও পর্যটকদের আসা-যাওয়া লেগেই থাকে। মন্দিরটি মাকড়াপাড়া কালীমন্দির নামেই খ্যাত। রয়েছে বীরপাড়া থেকে প্রায় ১৫ কিমি দূরে মাকড়াপাড়া চা-বাগান।

ভুটান সীমান্তের গা ঘেঁষেই রয়েছে মন্দিরটি। পাশেই রয়েছে ভুটানের শহর ঘোমটু। এই শহরটি ভুটানের প্রবেশ পথও বটে। একান্নটি সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছতে হয় পাহাড় চূড়ায় এই মন্দিরে। একসময় এখানেও একটি ছোটোখাট মন্দির ছিল। পরবর্তী কালে বাঙালি চা-বাগান মালিকদের উদ্যোগে বর্তমান মন্দির গড়ে ওঠে। রয়েছে নিত্য পুজোর ব্যবস্থা। বাঙালিরা তো বটেই, কালীপুজোর দিন দূর দূরান্ত থেকে আসা নেপালি জনগোষ্ঠীর মানুষেরাও ভিড় জমান। পুজো উপলক্ষে বসে মেলাও। চা-বাগান ঘেরা ডুয়ার্সের একটি ছোট জনপদ মেটেলি। এখানে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন কালীমন্দিরটি। কষ্টিপাথরের দু’ফুট উঁচু কালীমূর্তির নিত্য পুজো হয়ে আসছে। মন্দিরটি স্থাপিত হয় বঙ্গাব্দ ১২৭৮, ইং ১৮৭২-এ। পুনর্নির্মিত হয় ১৩৭৮ বঙ্গাব্দে। শুরুতে মন্দিরের গঠন ছিল কাঠের প্যাগোডা আকৃতির। পরে কংক্রিটের স্থায়ী কাঠামো তৈরি হয়। প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ২০১৩-তে তৈরি হয় বর্তমান মন্দিরটি। মন্দির চত্বরে রয়েছে লক্ষ্মীনারায়ণ ও জগন্নাথের পৃথক মন্দির। দীপান্বিতা কালীপুজোকে কেন্দ্র করে মেটেলি, চালসা, মালবাজার থেকে প্রচুর ভক্তরা ছুটে আসেন। সারা রাত পুজোপাঠ সেরে ফিরে যান সকালে। শুধু এলাকাবাসীর কাছেই নয়, উত্তরবঙ্গবাসীর কাছেও আলাদা আকর্ষণ রয়েছে এই কালীবাড়ির। একসময় আশপাশের বাগান-বাবুরা সন্ধ্যাবেলা এসে জড়ো হতেন মন্দির প্রাঙ্গণে। চলত নাটকের মহড়া। ছিল মন্দিরসংলগ্ন নাট্যমঞ্চও। সম্প্রতি মেটেলি সাংস্কৃতিক নাট্যমঞ্চ অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হয়েছে।

মন্দির কমিটির সভাপতি হরেন্দ্রনাথ দে জানান, চা-বাগান ঘুরতে এসে ভক্তরা ছাড়া পর্যটকেরাও ভিড় করেন। জানতে চান মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে এবং পুজোও দেন। বর্ষার সময় ছাড়া মন্দির চত্বরে পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy