এ বার উত্তরের বাজারে দার্জিলিং, ডুয়ার্স, ভুটানকে সরিয়ে রমরমা অপেক্ষাকৃত কম দামী নাগপুরের কমলা এবং কমলার মতো দেখতে ফল কিনোর। এর আরেক নাম মাল্টা। ব্যবসায়ীরা কিনোকে পঞ্জাবের কমলা বলে বিক্রি করছেন।
এই ব্যতিক্রমী চিত্রের কারণ উত্তরবঙ্গ এবং দার্জিলিঙের কমলা এ বারের বাজারে এক রকম অমিল। কারণ ফলন হয়েছে খুবই কম। ফলে আমজনতা শীতকালে নাগপুরের কমলা আর কিনো খেয়েই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন যে, এ বার দার্জিলিঙে অন্য বছরের তুলনায় ৯০ শতাংশ কম ফলন হয়েছে। ফলে এ সময় যে কমলায় বাজার ছেয়ে যেত সে কমলা বাজারে নেই। শিলিগুড়ির পাইকারি ফল বিক্রেতারা জানিয়েছেন যে, অন্য বার শিলিগুড়ির বাজারে উত্তরবঙ্গ এবং ভুটান থেকে রোজ পঞ্চাশ থেকে ষাট গাড়ি কমলা আসত। যার পরিমাণ ছিল ৫০০-৬০০ টন। শিলিগুড়ির বাজার থেকে সেই কমলা চালান যেত জলপাইগুড়ি সমেত উত্তরবঙ্গ এবং পার্শ্ববর্তী বিহার রাজ্যে। এ বছর ভুটানের কমলাও আসছে না। মাঝে মাঝে মিরিক থেকে ছোট পিকআপ ভ্যানে করে তিন থেকে চার গাড়ি কমলা আসছে। তার পরিমাণ সাকুল্যে দশ টনের বেশি না।
জলপাইগুড়ি এবং উত্তরবঙ্গের পাইকারি ফল ব্যবসায়ীদের একটা বড় অংশ শিলিগুড়ির পাইকারি ফলের বাজার থেকে কমলা এনে ব্যবসা করেন। জলপাইগুড়ির ফল ব্যবসায়ী পাপ্পু শা এবং অশোক শা বলেন, “আমরা এ বার শিলিগুড়ির পাইকারি সব্জি বাজারে গিয়ে দার্জিলিঙের কমলা পাচ্ছি না। আগে এ রকম হয়নি।”
শিলিগুড়ির পাইকারি সব্জি বিক্রেতা অনন্ত প্রসাদ, মুকেশ গুপ্তা বলেন, ‘‘এ বার নাগপুরে ফলন বেশি হওয়ায় সেই কমলা নিয়ে এসে আমরা ব্যবসা করতে পারছি। পঞ্জাবের কিনোও আনছি। এই দু’টি এলাকার ফলের জন্য এ বার ব্যবসা করতে পারলাম। না হলে কমলার ব্যবসা বন্ধ রাখতে হত।” কম আমদানির ফলে দার্জিলিঙের কমলার দামও বেড়েছে। দার্জিলিঙের খুব ছোট সাইজের কমলা জলপাইগুড়ির খুচরো বাজারে বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ছ’টাকা দরে। তার থেকে সামান্য বড় হয়ে গেলে তার দাম পড়ছে প্রতিটি ১০ টাকা। দার্জিলিঙের একেবারে বড় সাইজের কমলা এখন বাজারে নেই। সেই তুলনায় নাগপুরের সবচেয়ে বড় সাইজের কমলার দাম এখন প্রতিটি ৫ টাকা। পঞ্জাবের কিনোও বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি দাম ৫ টাকা দরে।
নাগপুরের কমলার সঙ্গে ভুটানের কমলার মিল আছে। কমলার রঙ হলদেটে। কিছুটা অংশ সবুজ আছে। খোসা এবং ফলের মধ্যে ফাঁপা জায়গা আছে। সহজে ছুলে খাওয়া যায়। স্বাদ একেবারে টক না আবার খুব মিষ্টিও না। কিনোর কমলা খোসা এবং ফলের মধ্যে ফাঁক নেই। চট করে ছুলে খাওয়া কঠিন। রসে ভরপুর। রং একেবারে টকটকে কমলা।
জলপাইগুড়ির খুচরো ফল ব্যবসায়ী জয়দেব দে, সঞ্জীব সাহা বলেন, “নাগপুরের কমলা এবং কিনো স্বাদে গন্ধে দার্জিলিং এবং ডুয়ার্সের কমলার কাছে কিছুই না। উপায় নেই। এগুলো বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।”
জলপাইগুড়ির এক লেখিকা এবং শিক্ষিকা অনিন্দিতা গুপ্ত রায় এ সময়টায় বরাবর দার্জিলিঙের কমলা ছুলে খেয়ে অভ্যস্ত। এ বার তাঁর প্রিয় কমলা তিনি পাচ্ছেন না। তিনি হতাশ হয়ে বলেন, “এ বার আমাদের এদিকের কমলা বাজারে নেই। বাজার থেকে কোনদিন কিনো কোনও দিন নাগপুরের কমলা আনছি। ছুলে খাওয়ার কোন প্রশ্ন নেই। রস করে খেতে হচ্ছে।” এ বার বাজার থেকে কমলা কিনে বিরক্ত জলপাইগুড়ির কবি বিজয় দে। তিনি বলেন, “কমলা নাম দিয়ে বাজারে যা বিক্রি হচ্ছে তা কিনে ঠকে গেছি। দেখতে সুন্দর। কিন্তু একেবারে টক। আমাদের এ দিকের কমলার ধারে কাছে আসে না।”