এ যেন ভিন্ন চিত্র। পুলিশ অফিসার হাত জোড় করে ভোটারদের আবেদন করছেন, দয়া করে ভোট না দিয়ে যাবেন না।
বুথ থেকে ফিরে যাওয়া ভোটারদের আনতে বাসেরও ব্যবস্থা করে দেবেন বলে জানালেন বিধাননগর থানার ওসি তপন পাল। সেই মতো দু’টো বাস এবং চারটে ছোট গাড়িরও ব্যবস্থা করে দেয় পুলিশ। প্রায় ৬ ঘণ্টা বাদে ভোটগ্রহণ শুরু হল ফাঁসিদেওয়া ব্লকের সৈয়দাবাদ হিন্দি স্কুলের বুথে। রাজ্য জুড়ে পুরসভা, পঞ্চায়েত ভোট এবং উপনির্বাচনে শাসকদলের হুমকি, মারধর, রিগিঙের অভিযোগ শুনেও পুলিশ নিষ্ক্রিয় থেকেছে বলে অভিযোগ। সাধারণ বাসিন্দাদের ভোটদানের অধিকার রক্ষা করতেও পুলিশ ‘ব্যর্থ’ বলে অভিযোগ উঠলেও ভিন্ন চিত্রই দেখা গিয়েছে শিলিগুড়ি লাগোয়া বিধাননগরের সৈয়দাবাদ হিন্দি স্কুলে।
শনিবার সকাল সাতটায় অন্য কেন্দ্রের মতো ভোট গ্রহণ শুরু হয় সৈয়দাবাদ স্কুলেও। যদিও ৩২টি ভোট হওয়ার পরেই গ্রাম পঞ্চায়েতের ইভিএম বিকল হয়ে যায়। ইভিএম পাল্টাতেই সময় লেগে যায় ৫ ঘণ্টা। স্কুলের সিংহভাগ ভোটাররাই সৈয়দাবাদ চা বাগানের বাসিন্দা। চড়া রোদে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে চা শ্রমিকদের মধ্যে। সাড়ে বারোটা নাগাদ ইভিএম বদলানোর পরে ভোট শুরু হবে বলে ঘোষণা হয়। সেই মতো চা শ্রমিকদের একাংশ লাইন দিতেই অন্যরা তেড়ে যান। একটি ভোটযন্ত্র পাল্টাতে কেন পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে সে প্রশ্ন তোলেন চা শ্রমিকরা। বিনোদ মিনজ, নিকলাই টোপ্পো-রা দাবি করতে থাকেন, তাঁরা কেউ ভোট দেবেন না। অনেকে ভোট না দিয়ে ফিরেও যেতে থাকেন। বিক্ষোভ শুরু হতে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছয় পুলিশ বাহিনী। স্কুলে পৌঁছেই ভোট করাতে ‘সক্রিয়’ হয়ে ওঠে পুলিশ। তৃণমূল, কংগ্রেস, বাম, বিজেপি সব দলের নেতাদের ডেকে ভোটারদের ডেকে আনার আর্জি জানান ওসি সহ অনান্য পুলিশ কর্মীরা। যদিও, ক্ষুব্ধ চা শ্রমিকরা নেতাদের কথাতেও ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।
বিনোদ মিনজের দাবি, ‘‘আমরা সকলে মিলে ঠিক করেছি, কেউ ভোট দিতে যাবে না। ভোরবেলায় ভোট দিতে লাইন দিয়েছিলাম। একটা যন্ত্র খারাপ হয়েছে বলে আমাদের রোদে পাঁচ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। যখনই জানতে চেয়েছি, বলেছে দশ মিনিটের মধ্যে নাকি ভোট শুরু হবে।’’ স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন চা শ্রমিকরা। এরপরেই ওসি তপনবাবু শ্রমিকদের মাঝে গিয়ে হাতজোড় করে সকলকে ভোট দেওয়ার আবেদন করতে থাকেন। ওসিকে বলতে শোনা যায়, ‘‘আপনাদের কী প্রয়োজন বলুন, প্রশাসনের থেকে ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। কিন্তু ভোটটা দিন।’’
চা শ্রমিকরা দাবি করেন, অনেকেই ভোট না দিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন, তাঁদের ভোটকেন্দ্রে আনার ব্যবস্থা করা হবে। প্রায় ৬ ঘণ্টা দেরিতে শুরু হওয়ায়, ভোট শেষ হতে রাত হয়ে যাবে, ফেরার ব্যবস্থাও করে দিতে হবে। চা শ্রমিকদের শর্তে রাজি হয়ে যান ওসি। তারপরেও, শ্রমিকরা দাবি করতে থাকেন সব দলের প্রার্থীরা এক হয়ে তাঁদের আশ্বাস দিলে ভোট দেবেন।
সব দলের প্রার্থীদের ডেকে আলোচনায় বসায় পুলিশ। গ্রাম পঞ্চায়েতের সিপিএম প্রার্থী রোজালিয়া মিনজ, তৃণমূলের প্রার্থা কুমুদিনি টোপ্পো, কংগ্রেস প্রার্থী এরমা টোপ্পো এবং বিজেপি প্রার্থী বিনীতা এক্কারা পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করে, চা বাগানের বাসিন্দাদের ভোট দেওয়ার আর্জি জানান। এরপরে পুলিশ দু’টি বাস এবং চারটে গাড়ি স্কুলে নিয়ে আসে। আশ্বাস মতো পদক্ষেপ হয়েছে দেখে ভোট দিতে শুরু করেন চা শ্রমিকরা।
মহকুমা পরিষদের তৃণমল প্রার্থী কাজল ঘোষ থেকে সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য মনোহর ব্রজবাসী সকলেই পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। মনোহরবাবুর কথায়, ‘‘পুলিশ অনেক চেষ্টা করেছে। না হলে তো সকলে ফিরেই যাচ্ছিলেন।’’ শনিবার রাত ৯টা-র পরেও সৈয়দাবাদ স্কুলে ভোট চলেছে। ওসি তপনবাবু ফোনে বলেন, ‘‘হাজারেরও বেশি ভোটার ছিল। সকলে যাতে ভোট দিতে পারেন, তার ব্যবস্থা প্রশাসনের তরফে করা হয়েছে।’’