শীতের রাত নামতেই ঘুম উবে যেতে শুরু করে শিলিগুড়ি মহকুমার ফাঁসিদেওয়ার ভারত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের। অনেকেই ঠান্ডার কনকনে রাত জেগে উঠে ইতিউতি ঘুরে দেখেন বাড়ির চত্বর বা গোয়ালঘর। সকলের মনেই আশঙ্কা, এই বুঝি কুয়াশার মধ্য থেকে শোনা গেল বহিরাগত লোকজনের আওয়াজ। গত বছর শীতের সময় থেকে একের পর এক ঘটনা ওই আশঙ্কা আরও বাড়িয়েছে বাসিন্দাদের। এই অবস্থায় শীতের শুরুতেই ফাঁসিদেওয়ার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলিতে রাতপাহারা দিতে ‘আরজি পার্টি’ গঠনে উদ্যোগী হল পুলিশ-প্রশাসন।
পুলিশ সূত্রের খবর, কালীপুজোর পরেই পুলিশ-প্রসাসন ও বিএসএফ মিলে গ্রামগুলিতে আরজি পার্টি গঠন হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েক দফায় আলোচনাও হয়ে গিয়েছে। অন্তত ৪০০ জন বাছাই করা বাসিন্দাকে নিয়ে বাছাই করা ১২টি গ্রামে ২০টি দল তৈরি করা হবে। রাত পাহারায় পুলিশ, বিএসএফের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ওই দলের সদস্যরা কাজ করবেন। প্রতি দলে ১৫-২০ জন সদস্য থাকবে। থানায় প্রতিটি দলের তালিকা, যোগাযোগের নম্বর তালিকাবদ্ধ থাকবে। রাতে ডিউটি অফিসার দলগুলির প্রধানদের নম্বরে টেলিফোন করে পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখবেন। পুলিশের তরফে দলগুলি টর্চের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ফাঁসিদেওয়ার বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবরই গরু চুরি এবং পাচারকারীদের স্বর্গরাজ্য বলে পরিচিত।
দার্জিলিং জেলার পুলিশ সুপার অমিত জাভালগি বলেন, ‘‘শীতের রাতে সীমান্ত এলাকায় কুয়াশা এবং ঠান্ডার সুয়োগ নিয়ে দুষ্কৃতীরা সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা করে। আমরা প্রশাসন, বিএসএফের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নজরদারি বাড়িয়েছি। আরও সতকর্তা হিসাবে আরজি পার্টি তৈরি করা হচ্ছে।’’ বিএসএফের উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ারের এক শীর্ষ কর্তা জানান, বাসিন্দাদের সাহায্য পেলে নজরদারির কাজটা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। গোপনে অনেক খবর মেলে।
প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রের খবর, ফাঁসিদেওয়া ব্লকের ঘোষপুকুর, বিধাননগর, ফাঁসিদেওয়া সদর ছাড়াও কমলা, ভোজনারায়ণ ও গঙ্গারাম চা বাগান এলাকায় বিভিন্ন সময়ে বহিরাগতদের আনাগোনার খবর মেলে। মহানন্দা নদীর জন্য কাঁটাতারের বেড়াবিহীন এলাকাকেই দুষ্কৃতীরা বরাবর বেছে নেয়। ধনিয়ামোড়, বন্দরগছ বা মুড়িখাওয়ার মত এলাকায় বিভিন্ন সময়ে গরু পাচার, চুরির খবর মেলে। গত বছর বর্ষার সময় হাতে গোনা কয়েকটি এমন দল তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু মহকুমা পরিষদ ভোট আসতেই ধীরে ধীরে আরজি পার্টিগুলি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ। অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ পড়তেই শীতের আবেশ শুরু হয়ে গিয়েছে। ভোররাত ঠান্ডার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ এলাকায় হালকা কুয়াশাও পড়ছে। আর তাতেই ফের সীমান্তের বহিরাগতদের ‘আনাগোনা’র আশঙ্কায় ভুগতে শুরু করেছে বাসিন্দারা।
ফাঁসিদেওয়ার বিডিও বীরুপাক্ষ মিত্র বলেন, ‘‘বিএসএফ, পুলিশ নজরদারির কাজ করছে। তবে নদী বরাবর খোলা সীমান্ত সবসময় উদ্বেগের কারণ হয়ে থাকে। আর শীতের রাতে তো গ্রামগুলিতে অনেক সময়ই ঘটনা ঘটেছে। তাই এলাকায় বাসিন্দাদের সহযোগিতা নিয়ে নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে।’’ বিডিও জানান, অনেকটা ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। সীমান্তে বিএসএফ, গ্রাম-সদরের বিভিন্ন প্রধান রাস্তা, এলাকায় পুলিশ আর গ্রামের ভিতরে আরজি পার্টি থাকবে। কালী পুজোর পরেই সব কিছু চূড়ান্ত করতে বৈঠক ডাকা হচ্ছে।
বিএসএফ সূত্রের খবর, ফাঁসিদেওয়া ব্লকের লালদাস জোত থেকে মুড়ি খাওয়া এলাকা অবধি প্রায় ২২ কিলোমিটার বাংলাদেশ সীমান্ত রয়েছে। এলাকাটি চটহাট, ফাঁসিদেওয়া এবং জালাস নিজামতারা গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে রয়েছে। সেখানে বিএসএফের লালদাস, বানেশ্বর, ফাঁসিদেওয়া, কালামগছ এবং মুড়িখাওয়াতে সীমান্ত চৌকি রয়েছে। লালদাস থেকে ধনিয়ামোড় অবধি কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে। কিন্তু বন্দরগছর অবধি প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার কোনও বেড়া নেই। মহানন্দা নদী এবং এপারের গ্রামের জমির সমস্যার জন্য কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যায়নি। এর সুযোগেই বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা বরবারই ফাঁসিদেওয়া সীমান্তে সব সময় সক্রিয় থাকে বলে অভিযোগ।
পুলিশ সূত্রের খবর, গতবছর ফাঁসিদেওয়ার সীমান্তে ওপারের দুষ্কৃতীদের আনাগানো বাড়তে থাকে। কোনও সময় পরপর গরুচুরি, ২৫০ বছরের পুরানো মন্দিরে চুরি হয়। এ দফায় গণপ্রহারের ঘটনাও ঘটে। এমনকি, বিএসএফের ম্যানপাক ছিনতাই-এর অভিযোগ সামনে আসে। গঙ্গারাম চা বাগানে দলবেঁধে অন্তত ২০ জনের দলকে তাড়া করে সীমান্ত পর ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাডা সুদামগছ, ঠাকুরপাড়া, কান্তিভিটা বা রূপনদিঘির মত বিভিন্ন এলাকায় গরু থেকে বাড়ির জিনিসপত্রের পরপর চুরিও হয়। ধনিয়ামোড় ছাড়াও বিডিও অফিস সংলগ্ন এলাকার বাঁশঝাড় থেকে রাতে সন্দেহভাজন এক বাংলাদেশিকে ধরাও হয়। এ ছাড়াও লাগোয়া উত্তর দিনাজপুর ও বিহার থেকে গাড়ি বোঝাই করে গরু এনে সীমান্ত পারাপারের চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ।