রাজ্যে দ্বিতীয় সেরা শিরোপা পাওয়ার পর এখন অধিকাংশ কৃষককে সমবায় আন্দোলনের আওতায় আনাই চ্যালেঞ্জ ‘জলপাইগুড়ি সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক’ এর। ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান সৌরভ চক্রবর্তীর বক্তব্য, আগামী দিনে পর্যটন ও ছোট চা বাগানেও সমবায়ের সুফল পৌঁছে দিতে চান তাঁরা।
উন্নত পরিষেবা, স্বচ্ছতা এবং সম্পদ বৃদ্ধির নিরিখে গত বছরের পর এ বারও রাজ্যে দ্বিতীয় সেরার শিরোপা পেয়েছে অনাদায়ী ঋণের ধাক্কায় এক সময় ডুবতে বসা ‘জলপাইগুড়ি সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্ক’। মঙ্গলবার ব্যাঙ্ক কর্তাদের হাতে ওই পুরস্কার তুলে দেন রাজ্যের সমবায় মন্ত্রী জ্যোতির্ময় ঘোষ।
ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান সৌরভ চক্রবর্তী বলেন, “কয়েক বছর আগেও ওই ব্যাঙ্কের ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ কোটি টাকা। সেটা মিটিয়ে ২০১৪-২০১৫ আর্থিক বছরে প্রায় ২ কোটি টাকা লাভ হয়েছে। বেড়েছে পরিষেবার পরিধি। সব দিক থেকে এ বারও আমরা রাজ্যের দ্বিতীয় সেরা সমবায় ব্যাঙ্ক।” ব্যাঙ্ক সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০০ সাল থেকে গত তেরো বছরে অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৯ কোটি টাকা। এক সময় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে যায় যে ব্যাঙ্ক টিকে থাকবে কিনা সেই প্রশ্ন সামনে চলে আসে। ওই পরিস্থিতিতে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে দায়িত্ব নিয়ে নতুন পরিচালন কমিটি অনাদায়ী ঋণ আদায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মাত্র দেড় বছরের মধ্যে প্রায় ৩৬ কোটি টাকা আদায় হয়। ব্যাঙ্ক কর্তাদের দাবি, ওই সাফল্য ঘুরে দাঁড়াতে পথ দেখায়।
ব্যাঙ্কের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার শুভ্রদেব দাস জানান, ব্যাঙ্কের ‘ক্যাপিটাল টু রিস্ক ওয়েটেড রেশিও’ গত আর্থিক বছরে ছিল ৭.০৬। এ বার সেটা বেড়ে হয়েছে ৯.০৬। ২০০৬ সালে সঞ্চয় প্রকল্প চালুর পরে এক সময় ব্যাঙ্কের বেহাল দশা দেখে গ্রাহকেরা ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছিলেন। চলতি বছরে ওই প্রকল্পে গচ্ছিত টাকার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি টাকা।
শুধু তাই নয়। গত দেড় বছরে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আড়াই লক্ষ। সাড়ে চার হাজার সাধারণ গ্রাহককে ঋণ দেওয়া হয়েছে। ব্যাঙ্কের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার বলেন, “সম্পদ সৃষ্টিতে বিরাট সাফল্য এসেছে। ২০১৩-২০১৪ আর্থিক বছরে সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩০১ কোটি টাকা। বর্তমানে সেটা বেড়ে হয়েছে ৩৭১ কোটি টাকা।”
ব্যাঙ্ক সূত্রে গিয়েছে, পরিষেবার আওতায় থাকা চাষির সংখ্যাও বেড়েছে। ২০১৩-২০১৪ আর্থিক বছরে ৩৮ হাজার চাষিকে ৬২ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ২০১৪-২০১৫ আর্থিক বছরে ৫২ হাজার চাষিকে ৯৪ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। ব্যাঙ্কের ভাইস চেয়ারম্যান কমলচন্দ্র রায় বলেন, ‘‘সমবায় ব্যাঙ্কের প্রধান লক্ষ্য চাষিদের পাশে দাঁড়ানো। তাই কোনও চাষি ঋণের জন্য ব্যাঙ্কে এসে যেন ফিরে না যায় সে দিকে কড়া নজর রাখা হয়েছে।’’
তিনি জানান, ভূমিহীন চাষিদেরও ঋণ দেওয়া হচ্ছে। গত বছর চাষিদের যে ঋণ দেওয়া হয়েছিল তার ৯৬ শতাংশ ফেরত এসেছে। ব্যাঙ্ক ঘুরে দাঁড়াতে চাঙ্গা হয়েছে ১১৩ টি সমবায় কৃষি ঋণদান সমিতি। চাষের জন্য ঋণ দরকার হলে বাইরে হাত পাততে হচ্ছে না চাষিদের।
ময়নাগুড়ির বাসিলারডাঙা এলাকার চাষি শুকারু বর্মন বলেন, “পাঁচ বছর আগেও চাষের জন্য মহাজনের কাছে ১৩ শতাংশ সুদে ধারে টাকা নিয়েছি। দু’বছর থেকে সমবায় কৃষি ঋণদান সমিতি ৭ শতাংশ সুদে সহজে ঋণ দিচ্ছে। তাই চাষের কাজে সমস্যা হচ্ছে না।” একই দাবি করেন বেরুবাড়ি এলাকার চাষি মহেশ রায়ও। তিনিও জানান, সহজ সুদে ঋণ মেলায় এখন চাষ অনেক সহজ হয়েছে।
নজরুল মঞ্চে এক অনুষ্ঠানে ব্যাঙ্কের তরফে পুরস্কার নেন ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান সৌরভবাবু। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠিয়েছেন তাঁকে।