Advertisement
E-Paper

স্কুল থেকে মেলায় দেখানো হচ্ছে মিলিদের কাহিনি চিত্র

অষ্টম শ্রেণির ছোট্ট মিলি এবং তার সহপাঠীদের এ এক অন্য কাহিনী। আর দশটা গ্রাম্য পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা মেয়েদের থেকে অনেকটাই যেন আলাদা। সমাজ, পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নাবালিকা বিবাহ রুখে দেওয়ার লড়াই।

কৌশিক চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৩ জুলাই ২০১৫ ০২:১৮
তথ্যচিত্রের কভার। —নিজস্ব চিত্র।

তথ্যচিত্রের কভার। —নিজস্ব চিত্র।

অষ্টম শ্রেণির ছোট্ট মিলি এবং তার সহপাঠীদের এ এক অন্য কাহিনী। আর দশটা গ্রাম্য পরিবেশে বড় হয়ে ওঠা মেয়েদের থেকে অনেকটাই যেন আলাদা। সমাজ, পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নাবালিকা বিবাহ রুখে দেওয়ার লড়াই। আর তা দেখে কার্যত মুগ্ধ প্রশাসন-পুলিশ কতার্রা। মিলির নাবালিকা বিয়ে তো রোখা গিয়েছিল, কিন্তু বাকি মিলিরা? সেই প্রশ্ন মাথায় রেখেই, গ্রামে গ্রামে মেয়েদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে মিলির কাহিনীকেই হাতিয়ার করেছে শিলিগুড়ি মহকুমা প্রশাসন।

মিলির ঘটনাকে ঘিরেই শিলিগুড়ি মহকুমার ফাঁসিদেওয়া ব্লক প্রশাসনের উদ্যোগে তৈরি করা হয়েছে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র। নাম-‘একটি মিলির কাহিনী’। বিভিন্ন স্কুল থেকে সরকারি মেলা, স্বেচ্ছাসেবীদের সচেতনতা শিবির সর্বত্র দেখানো শুরু হয়েছে তথ্যচিত্রটি। সেখানে রয়েছে কন্যাশ্রী প্রকল্পের বিবরণও। ইতিমধ্যে নবান্নেও পাঠানো হয়েছে তথ্যচিত্রটি। শিলিগুড়ি মহকুমাশাসক দীপাপ প্রিয়া তথ্যচিত্রটি বিভিন্ন সাইটে আপলোডও করেছেন।

মহকুমা শাসক বলেন, ‘‘নাবালিকা বিবাহ রোখার জন্য মহকুমা প্রশাসন পুলিশ, বাসিন্দাদের নিয়ে সারা বছর কাজ করে। মিলির ঘটনাটি একটা দৃষ্টান্ত। আগামী অগস্ট মাস থেকে আবার কন্যাশ্রী প্রকল্প নিয়ে শিবির শুরু হবে। ওই তথ্যচিত্রটি সেখানে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।’’

প্রশাসনের কয়েকজন আধিকারিক জানান, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, বীরভূম বা পুরুলিয়াতে রাজ্যে নাবালিকা বিবাহের কথা মাঝেমধ্যেই শোনা যায়। সেই তুলনায় দার্জিলিং বা উত্তরের এই জেলাগুলিতে এর সংখ্যা অনেকটাই কম। ফাঁসিদেওয়ার ঘটনাটিকে সামনে রেখে ছোট ছোট মেয়েদের সচেতনতা বাড়ানোর কাজ অনেকটাই সহজ। সেই লক্ষ্যেই তথ্যচিত্রটির ব্যবহার শুরু হয়েছে।

মিলির (নাম পরিবর্তিত) ঘটনাটি ঘটেছিল গত বছরের অগস্ট মাসে ফাঁসিদেওয়ার রূপনদিঘিতে। নজরুল শতবার্ষিকী বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীকে স্কুলে কিছুদিন ধরে মনমরা হয়ে ঘুরতে দেখে তার সহপাঠীরা। এমনকি, খেলাধূলা বন্ধ করে, কোনও সময় স্কুলে না দিয়ে মিলি একা একা ঘুরে বেড়ানোও শুরু করে। পড়াশুনোতেও মন বসছিল না মিলির। বন্ধুদের নজরে পড়তেই তারা মিলির কাছে কী হয়েছে জানতে চায়। মিলি তাদের জানায়, বাবা-মা তার বিয়ে ঠিক করেছে পাশের গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে। কাঠমিস্ত্রি বাবা আর পড়াতে পারবে না। ছোট ভাই পড়াশুনো করবে। তাই আমার বিয়ে দেওয়া হবে। ছেলের বাড়ি কিছু টাকাও বাবাকে দেবে।

বন্ধুরা সব শোনার পর ঠিক করে, মিলির বিয়ে আটকাতেই হবে। ঠিক হয় স্কুল লাগোয়া বিডিও অফিসে গিয়ে তারা সব জানাবেন। একটি চিঠিতে মিলির ঘটনাটি লিখে তারা বিডিও অফিসে গিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল। শেষে বিডিও তা দেখে তাদের ডেকে সব শোনেন। পুলিশের মাধ্যমে বিডিও অফিসে আনানো হয়, মিলির বাবা-মাকে। নাবালিকা বিয়ে নিয়ে তাদের বোঝানোর পর তারা বিয়ে বন্ধ করেন। মেয়েকে পড়ানোর কথাও জানিয়ে যান। মিলি এখন স্কুলে পড়ছে।

তার মাস ছয়েক পর, ফাঁসিদেয়ার বিডিও বীরুপাক্ষ মিত্র নিজের উদ্যোগে তৈরি করিয়েছেন তথ্যচিত্রটি। বিডিও ছাড়াও অল্প কিছুক্ষণের জন্য সেখানে অভিনয় করেছেন ফাঁসিদেওয়া থানার ওসি কেনিথ ফোনিং-ও। মোট ১৮ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে শিশু শিল্পীদের ছাড়াও কয়েকজন বড় শিল্পীও কাজ করেছেন। স্কুল, গ্রাম, বিডিও অফিসেই তথ্যচিত্রটির শ্যুটিং হয়েছে। সেখানে মিলিকে কীভাবে বাবা-মা বিয়ে দেওয়া ঠিক করে, স্কুলে মিলির বন্ধুরা কী করে তা জেনে রোখে সবই দেখানো হয়েছে। বিডিও বলেন, ‘‘মিলি আর ওর বন্ধুরা যা করেছিল, তা ভাবাই যায় না। তা মাথায় রেখেই তথ্যচিত্রটা তৈরির কথা ভাবি। সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন স্কুলে আমরা এটা দেখাচ্ছি।’’

ইতিমধ্যে পুলিশ আর স্বেচ্ছাসেবীরাও তথ্যচিত্রটির ব্যবহার শুরু করেছেন। জেলা পুলিশের তরফে কয়েক দফায় বিভিন্ন সচেতনতা কমর্সূচিতে তা দেখানো হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার অমিত জাভালগি জানান, আগামী দিনেও আমরা স্কুল, কলেজের অনুষ্ঠানে তথ্যচিত্রটি ব্যবহার করব। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সদস্য দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বাল্য বিবাহ রোখা নিয়ে চা বাগানের কয়েকটি শিবিরে ছবিটি দেখিয়েছি। আরও কিছু জায়গায় দেখানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy