Advertisement
E-Paper

সংস্কৃতি যেখানে যেমন...

২ মে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতর ও একটি বেসরকারি চ্যানেলের উদ্যোগে শিলিগুড়ির দীনবন্ধু মঞ্চে রবীন্দ্র উৎসব উপলক্ষে মঞ্চস্থ হল ‘বাল্মীকি প্রতিভা থেকে শুরু’। বিদ্বজ্জনসমাগম সভায় স্থির হয় নাটক হবে। বিষয় কী হবে? ঠিক হল দস্যু রত্নাকরের কবি হওয়ার কাহিনিকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে নাটক। রবীন্দ্রনাথ বাল্মীকি প্রতিভা গীতিনাট্যটি লিখলেন কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর সারদামঙ্গল কাব্যের প্রেরণায়।

শেষ আপডেট: ০৮ মে ২০১৫ ০২:৫১

বাল্মীকির আখ্যানেই রবীন্দ্র-জন্ম উদযাপন

২ মে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতর ও একটি বেসরকারি চ্যানেলের উদ্যোগে শিলিগুড়ির দীনবন্ধু মঞ্চে রবীন্দ্র উৎসব উপলক্ষে মঞ্চস্থ হল ‘বাল্মীকি প্রতিভা থেকে শুরু’। বিদ্বজ্জনসমাগম সভায় স্থির হয় নাটক হবে। বিষয় কী হবে? ঠিক হল দস্যু রত্নাকরের কবি হওয়ার কাহিনিকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে নাটক। রবীন্দ্রনাথ বাল্মীকি প্রতিভা গীতিনাট্যটি লিখলেন কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর সারদামঙ্গল কাব্যের প্রেরণায়। সারদা অর্থে সরস্বতী, তার মঙ্গলগাঁথাই সারদামঙ্গল। বালিকার বেশে সরস্বতীর আবির্ভাব ও তিরোধান ঘিরে নাটকের মূল কাহিনি গড়ে উঠেছে। সরস্বতীর সঙ্গে কবি বাল্মীকির যে সম্পর্ক অর্থাৎ প্রীতি, ভালবাসা, আবেগ, অনুরাগ তাই দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে নিয়ে যায়।

শুরুতে বেহালার সুর—আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া (সংহিতা পাল ও ক্যামেলিয়া চক্রবর্তী) ছড়িয়ে দিল প্রেক্ষাগৃহের কোণায় কোণায়। সে আবহেই মঞ্চে কথকতা ঢঙে গানের দল ধরল ‘নমঃ নমঃ মহাশয় করি নিবেদন/ মম শিরে পদধূলি করুন অর্পণ’ (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাবা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরারোপিত)। কথকতা চলাকালীন দৃপ্ত ভঙ্গিতে একে একে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটল বাল্মীকি, দস্যুদল, ব্যাধ, লক্ষ্মী, সরস্বতী, বালিকার। দর্শকরা পরিচিত হলেন বাল্মীকি প্রতিভার চরিত্রগুলির সঙ্গে। আলোচনাংশে সে সব কিছু ফিরিয়ে আনা হয়েছে। কী ভাবে? প্রতি দৃশ্য শেষ হওয়ার পর সূত্রধর নির্দেশ দেন পূর্ববর্তী দৃশ্যের গানগুলি কোন বিদেশি সুর থেকে নেওয়া, তার উৎস কোথায়, এমন নানা তথ্য। বাল্মীকির কালী বন্দনার গান—কালী কালী বল রে আজ-এর মূল সুরটি আইরিশ নাবিক ন্যানসি লি-র সুরে অফ অল দ্য ওয়াইভস অ্যাজ এভার ইউ নো, স্বাদ পান শ্রোতারা অংশুমান পালের কণ্ঠে।

আলোচনাবদ্ধ গান রয়েছে তিনটি ‘সকাল বেলার আলোয় বাজে’, ‘বিদায় বেলার ভৈরবী’ (রাজর্ষি মজুমদার), ‘প্রখর তপন তাপে’ (শম্পা ঘোষ) এবং ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’ গান—রাজর্ষি মজুমদার, নৃত্য— সহেলী বোস)। রয়েছে কবিতা ‘আমি’ (গীতালি চক্রবর্তী), শুভঙ্কর গোস্বামীর কবিতা (দুঃখের আধার রাত্রি) পাঠের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন সহেলি বসু। রাজর্ষি মজুমদার ও শম্পা ঘোষের গানগুলি ছিল সজীব, শুনতে বেশ ভাল লাগে। সহেলি বসুর একক নৃত্য দু’টি স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বকীয়তায় উজ্জ্বল। কবিতায় গীতালি চক্রবর্তীর অনায়াস উচ্চারণ ও স্বরক্ষেপণ অন্য মাত্রা দিয়েছে।

নাট্য নির্দেশক শুভঙ্কর গোস্বামী। অমিতাভ ঘোষ (বাল্মীকি), প্রিয়াংকা পাকড়াশি (লক্ষ্মী), জয়িতা সেন (সরস্বতী), সুচরিতা ঘোষ (বালিকা), কুশল বোস (ব্যাধ), শুভঙ্কর গোস্বামী, জয়, কুশল বোস (দস্যু) যথাযথ। সংযোজনায় অতসী দাশগুপ্ত, সিন্থেসাইজার সুপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়, তবলায় রানা। আলাদা করে বলতে হয় পোশাক পরিকল্পনার কথা। মনে পড়িয়ে দেয় ভাইঝি ইন্দিরার রবীন্দ্রস্মৃতি—‘রবিকাকার বাল্মীকি সাজে পিঠের দিকে যে লম্বা জোব্বার মতো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাতে বিলেতি রাজাদের ম্যান্টেলের আভাস’। আর তার সঙ্গে রুদ্রাক্ষের মালা। লক্ষ্মী, সরস্বতীকে সাধারণ পৌরাণিক রীতি অনুযায়ী সাজানো হয়েছিল। দস্যুদের কাবুলিওয়ালার সাজ। এ যেন জোড়াসাঁকোয় অভিনীত বাল্মীকি প্রতিভার পুনরুদ্ধার।

বেহালাবাদক দু’জনের পরনে ছিল পাশ্চাত্য পোশাক শার্ট, প্যান্ট কোট আর তাদের মাথায় ফুলের রেথ, সঙ্গে ডাফলি বাদকের (রানা) পরনে ভারতীয় পোশাক পাজামা, পাঞ্জাবি এবং মাথায় পাগড়ি। তৃতীয় দৃশ্যে যখন বাল্মীকি কৃষ্ণবর্ণা কালীমাতার চরণ ছেড়ে সরস্বতীর শ্বেত শুভ্র চরণে আত্মসমর্পণের দিকে যাত্রা করছে, তখন তার জোব্বার রং বদলে হয়ে যায় লাল থেকে সাদা। বিষয় ভাবনা থেকে পোশাক পরিকল্পনা থেকে গ্রন্থন— সব কিছুতেই অভিনবত্বের দাগ রেখেছেন অংশুমান পাল। প্রচলিত ছক ভেঙে অন্যভাবে রবীন্দ্রনাথকে ছুঁয়েছেন তিনি। আন্তরিক প্রয়াস। প্রেক্ষাগৃহে বসে এই প্রয়াসে সামিল ছিলেন যাঁরা এবারের ২৫ শে বৈশাখে নিঃসন্দেহে তাঁরা খুঁজে নেবেন চিরচেনার পাশাপাশি অপরিচিত রবীন্দ্রনাথকেও। প্রযোজনাটির সাফল্য বোধ হয় এখানেই।

কবিতার কর্মশালা

সম্প্রতি ‘কবিতার কর্মশালা’ বসেছিল মালদহের সামসি কলেজে। উদ্যোক্তা ছিল কলেজের বাংলা বিভাগ এবং বালুরঘাটের ‘মধ্যবর্তী’ ও ‘প্রাকৃত’ পত্রিকাগোষ্ঠী। এই শিবিরে শিলিগুড়ি থেকে ‘কবিতার লাইটহাউস’, চাঁচলের ‘সেনাপতি’ সাহিত্যগোষ্ঠী, মালদহের ‘কবি স্টেশন’, ‘অন্বেষা’, ‘আরণ্যক’, রায়গঞ্জের ‘অভিসন্ধি’, ‘বাউন্ডুলে’, হরিশচন্দ্রপুরের ‘সাহিত্য সেনা’-সহ প্রায় ১১টি পত্রিকার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। একদিনের এই কর্মশালাটি উদ্বোধন করেন সামসি কলেজের অধ্যক্ষ ড. প্রলয়কান্তি ঘোষ। প্রশিক্ষক ছিলেন অমলকান্তি রায়, মনোজকুমার ভোজ, বিশ্বরূপ দে সরকার এবং আবদুল অহাব। অনুভূতিশীল মানুষ মাত্রই কবিতা লিখতে পারে। কবিতা লেখার মূল মন্ত্র যে অনুভব সে কথা তুলে ধরেন অমলকান্তি রায়। কবি হতে গেলে কবিতার পাঠক হওয়ার প্রাথমিক শর্তের কথা জানান আবদুল ওয়াহাব। কবিতার আবহ নিয়ে আলোচনা করেন বিশ্বরূপ দে সরকার। জীবনানন্দ, নজরুল, বুদ্ধদেব বসু কিংবা কল্লোল গোষ্ঠীর মতো কবি বা কবিতাগোষ্ঠীর মানসিকতা বা বিশেষ ধারার কথা তিনি তুলে ধরেন।

ভিন্ন সুর শোনা যায় মনোজ কুমার ভোজের আলোচনায়। তাঁর মতে, কবিকে গোষ্ঠীভুক্ত বলে চিহ্নিত করলে তার স্বাতন্ত্র্যকে ক্ষুণ্ণ করা হয়। মনোজবাবুর লেখা ‘কবিতা পাঠকের প্রস্তুতি’ ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠে আসে। তিনি জানান, কবিতা পাঠকের কাছে পৌঁছবার আগে বহু বার পাঠ করতে হয়। হাজারো জিজ্ঞাসা— যা কবিতা লেখার বা পড়ার মুখ্য সূত্র হয়ে ওঠে। কর্মশালায় তরুণ কবিদের মধ্যে অংশ নিলেন আফরোজা ইয়াসমিন, রথীন্দ্র সাহা, উৎস রায়চৌধুরী, দিব্যেন্দু স্বর্ণকার, তন্ময় বসাক, সুজয় মণ্ডল-সহ আরও অনেকে। প্রকাশিত হয় ‘মধ্যবর্তী’ পত্রিকার এপ্রিল সংখ্যা।

ফিরে দেখা

মহাজীবন কথা সাধারণত আখ্যানধর্মী হয়। কিন্তু অরবিন্দ ডাকুয়ার ‘রায়সাহেব পঞ্চানন বর্মা’র মূল আকর্ষণ গ্রন্থটি বিশ্লেষণধর্মী। শব্দচয়ন, বাক্যগঠন, যুক্তি উপস্থাপন, প্রতিযুক্তির খণ্ডন—এ সবেরই সার্থক মেলবন্ধন ঘটেছে গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উত্তরের ‘মহর্ষি-মনীষী পঞ্চানন বর্মা’কে দেখেছেন লেখক। সেই দেখা থেকে সংকলিত ‘ক্ষত্রিয় আন্দোলন এবং পঞ্চানন বর্মার রাজনৈতিক জীবন’, ‘পঞ্চানন বর্মার সামাজিক কাজ’, ‘শিক্ষা ভাবনা’, ‘কৃষক সমাজ ও পঞ্চানন’—এমন সব অধ্যায়। নির্যাতিতাদের ‘ক্ষত্রিয় সমিতি’র গৃহে আশ্রয় প্রদান, আত্মরক্ষার জন্য লাঠি খেলা, ছোরা খেলা শেখানোর পাশাপাশি তাঁদের আইনি সহায়তা এবং স্বাবলম্বনের জন্য হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়া—প্রতিটি পদক্ষেপই তাঁর জন্মসার্ধশতবর্ষেও প্রাসঙ্গিক। একই সঙ্গে এই সময়ের প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ‘রায়সাহেব পঞ্চানন বর্মা’ও।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy