আবহাওয়া বিরূপ তো ছিলই, এ বার একের পর এক ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত নেপালের পরিস্থিতির জেরে মাথা হাত পড়েছে শিলিগুড়ি মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকার চাষিদের। গত সপ্তাহেও দু’দফায় ‘আফটার শক’-এ কেঁপে উঠেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র।
কৃষি দফতর সূত্রের খবর, মহকুমার খড়িবাড়ি এবং ফাঁসিদেওয়া ব্লকের বহু চাষিই বর্ষাকালীন তো বটেই সারা বছর জমির সব্জি নেপালে বিক্রি করে থাকেন। একে তো উত্তরবঙ্গের বাজারের থেকে নেপালে সব্জির দাম বেশি পাওয়া যায়, তার ওপর নেপাল থেকেও ব্যবসায়ীরা টাকা দিয়ে সব্জি নিয়ে যান। কিন্তু গত দু’মাস ধরে পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে গিয়েছে। টানা ভূমিকম্পে নেপালের সর্বত্রই প্রায় পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছে। বহু মানুষের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে এখনও ঘর ছাড়া, ত্রাণ শিবিরে। গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ত্রাণ হিসেবে পাঠানো প্যাকেটজাত খাবার নেপাল জুড়ে। এই অবস্থায় সব্জি আর কার্যত বিক্রি হচ্ছে না নেপালে। ওপারের বাসিন্দারাও দিনভর ভিড় করছেন না সীমান্ত লাগোয়া এপারের গ্রামগুলিতে।
মার্চ মাস অবধিও প্রতিদিন নেপালে ১০-১২ টন সব্জি যেত। মে থেকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলেও জুনের শেষ নাগাদ পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১-২ টনের মতো। এই অবস্থার মধ্যেই গত এক মাসে ঝড়, শিলাবৃষ্টি এবং প্রাক বর্ষা অত্যধিক বর্ষায় ক্ষতিও হয় সব্জির। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে সব্জির দাম পড়তে শুরু করে। গত মাসে এক দফায় চাষিদের ক্ষতিপূরণও দিতে হয়। আরেক দফায় আবেদন করে দফতরের তরফে তা পাঠানো হয়েছে কলকাতায়। উল্লেখ্য, শিলিগুড়ি মহকুমার সব্জির নেপালে চাহিদার কথা মাথায় রেখে সীমান্ত এলাকাগুলিতে দুই পারের ব্যবসায়ীদের সুবিধার জন্য ছোট ছোট হাটশেড তৈরির পরিকল্পনাও নিয়েছে সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)।
কৃষি দফতরের শিলিগুড়ির অন্যতম সহ কৃষি অধিকর্তা মেহফুজ আহমেদ বলেন, ‘‘নেপালের এই অবস্থার জন্য মহকুমার বিস্তীর্ণ এলাকার বহু চাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। চাহিদা একেবারে নিম্নগামী হওয়ায়, সেই ভাবে সব্জি আর ভূমিকম্প বিধ্বস্ত নেপালে যাচ্ছে না। রোজই চাষিরা এসে নানা কথা বলছেন। পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা হচ্ছে।’’ তিনি জানান, নেপালের ব্যবসায়ীরা এখানে এসেই সব্জি নিয়ে যান। আবার অনেকে কাঁকরভিটা দিয়ে গিয়ে তা দিয়ে আসেন। সেই জায়গায় অন্যত্র সব্জি পাঠাতে পরিবহণ খরচ বেশি লাগায়, দাম বেশি হওয়ায় চাষিরা উৎসাহ পান না। তাঁদের অন্য বাজারের অল্প অল্প করে সব্জি পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তা ছাড়াও গত একমাসে প্রাক বর্ষার বৃষ্টি প্রায় ১০১ মিলিমিটার বেশি হয়েছে। এতে চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
দফতর সূত্রের খবর, মহকুমায় শীতকালে প্রায় ৬-১০ হাজার হেক্টর জমিতে সব্জি চাষ হয়। উঁচু এবং মাঝারি জমিতে চাষ কেবলমাত্র চাষ হওয়ায় বর্ষার সময় পরিমাণ ৩-৫ হাজার হেক্টরে নেমে আসে। খোলা জমিতে আলু, শসা, করলা, মটর, ব্রোকোলি, বিনস, বেগুন, পটল ফুলকপি ছাড়াও পলি আচ্ছাদনের জমিতে রোদ এবং বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচিয়ে এই সময় পালংশাক, ধনেপাতা, রাইশাক চাষ হয়। নেপালে পাঠানো হয় প্রচুর পরিমাণে বাদামও। প্রতিটি সব্জিই নেপালের বাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আবার জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর অবধি নেপালের পাহাড়ি এলাকা থেকে বাধাকপি, ফুলকপি, মুলো এবং টমেটো এপারে আসে। এ বার ভূমিকম্পে সেখানকার জমি এবং চাষিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই সব্জিও এ বার খুবই কম পরিমাণে আসবে বলেই ধরা হয়েছে।
নেপাল সীমান্ত লাগোয়া শিলিগুড়ি মহকুমার ময়নাগুড়ির অনাদি বর্মন, দুলালজোতের দীনেশ বর্মন, দুধগেটের তিমিলাল সিংহ অথবা গৌর সিংহ জোতের বিশ্ব বর্মনদের মতো চাষিরা জানান, প্রকৃতি আমাদের উপর এ বার পুরোপুরি বিরূপ। একে তো বর্ষার শুরু আগেই প্রচুর বৃষ্টি, ঝড় শিলাবৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। আবার গত তিন মাস ধরে ভূমিকম্পে নেপালে সব্জি পাঠানো প্রায় বন্ধই। এখানে ওখানে সব্জি পাঠিয়ে চলছে। তবে অবস্থা খুবই খারাপ। ওই চাষিরা জানান, এখানকার সব্জি পানিট্যাঙ্কি, কাঁকরভিটা হয়ে নেপালে ঢোকে। অনেক ব্যবসায়ী এপারে এসে আগে থেকে বায়নাও করে যেতেন। পরে সব্জি চাহিদা মতো বিরাটনগর, কাঠমান্ডু, ধুলাবাড়ি-সহ বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়। তাঁরা এখন পরিস্থিতি ভাল হওয়ার আশায় রয়েছেন।