শতবর্ষ পেরোলেও সাবালক হয়েছে কি শিলিগুড়ি! অন্তত, অবসর কাটানোর জায়গা, বিনোদনের পরিকাঠামোর প্রশ্নে এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খায় শহরের আনাচে-কানাচে। কারণ, শহরে পার্কের সংখ্যা হাতে গোনা। নাটক-সিনেমা দেখার জায়গাও জনসংখ্যার তুলনায় অতি নগন্য। কয়েক বছরের মধ্যে গড়ে ওঠা দুটি বড় মাপের বাতানুকূল শপিং মলই যেন সপ্তাহান্তের বাধ্যতামূলক গন্তব্য হয়ে উঠেছে অনেকের। ছুটিছাটার দিনেও সেখানে উপচে পড়ে ভিড়।
অথচ শহরবাসীদের অনেকেই মনে করেন, সরকারি তরফে সদিচ্ছা না-থাকার জন্যই শিলিগুড়ির বাসিন্দাদের অবসর কাটানো কিংবা বিনোদনের আধুনিক পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। সাড়ে তিন দশকের বাম আমল থেকে হালের তৃণমূল জমানা, সেই পরিকাঠামো তৈরি হয়নি কেন তা নিয়েই শহরে ক্রমশ ক্ষোভ দানা বাঁধছে।
ঘটনা হল, শহরে বেশ কয়েকটি বড় মাপের পার্ক রয়েছে। সেখানেই ঠাঁই নেই পরিস্থিতি। কোথাও আবার পার্ককে ঘিরে এমন নেশার আসর চলছে যে নেশাগ্রস্তরা ছাড়া অন্যরা গেলেই অস্বস্তিতে পড়েন। তা ছাড়া শহরের পার্কগুলিতে সারা দিন কাটানোর মতো পরিকাঠামো কোথাও নেই। পুরসভা কিংবা প্রশাসনের তরফে ‘রেস্ট শেড’, আধুনিক শৌচাগার কিছুই তৈরি করা হয়নি। ডাম্পিং গ্রাউন্ড যেখানে রয়েছে, সেই ইস্টার্ন বাই পাস এলাকায় বড় মাপের বিনোদন পার্ক গড়ার সমঝোতাপত্র সই হয়েছিল প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর আমলে। তা বাম জমানায় আলোর মুখ দেখেনি।
উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব দায়িত্ব পাওয়ার পরে আরেকবার সেই বিনোদন পার্ক গড়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাও হয়নি। সূর্য সেন পার্ককে আধুনিক ভাবে সাজিয়ে টয় ট্রেন চালানোর ব্যবস্থা করেছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী। সেই টয় ট্রেনও বন্ধ হয়ে রয়েছে। তা ছাড়া সূর্য সেন পার্কে দিনভর কাটানোর কোনও পরিকাঠামোই তৈরি হয়নি। এমনকী, শিলিগুড়ির উপকণ্ঠে সরিয়া পার্ক ঘিরে বহু কোটি টাকার কর্মকাণ্ড চললেও সেখানে দিনভর কাটানোর মতো আধুনিক পরিকাঠামো এখনও তৈরিই হয়নি। বিনোদনের জায়গা বলতে রয়েছে তথ্যকেন্দ্র ও কয়েকটি মাল্টিপ্লেক্স।
দেশ-বিদেশের নানা শহরে অবসর-বিনোদনের ব্যাপারে যাঁরা ওয়াকিবহাল, তঁদের অনেকেই মনে করেন, নেতা-কর্তারা একটু আন্তরিক ভাবে উদ্যোগী হলেই শিলিগুড়িবাসীর অবসর কাটানো কিংবা বিনোদনের পরিকাঠামো তৈরি করা যেত। বিশেষত, অবস্থানগত ভাবে শিলিগুড়ি দারুণ জায়গায় রয়েছে।
যেমন, শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেট গঠনের পরে বিস্তীর্ণ এলাকা তার আওতায় এসেছে। একদিকে তিস্তার চর ঘেঁষা চমকডাঙ্গি থেকে গজলডোবা, অন্যদিকে ফুলবাড়ির বাংলাদেশ সীমান্ত। ঘটনাচক্রে, গজলডোবায় বিশ্ব মানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ার কাজে নেমেছে রাজ্য সরকার। সে জন্য ১০০ কোটি টাকা খরচও হয়ে গিয়েছে বলে সরকারের দাবি।
ঘটনাচক্রে, ইতিমধ্যেই গজলডোবা হয়ে উঠেছে দিনভর কাটানোর অন্যতম জনপ্রিয় জায়গায়। বিশেষত, ছুটির দিনে শিলিগুড়ি শহরের বাসিন্দাদের ভিড় উপচে পড়ে গজলডোবায়। পুলিশ-প্রশাসন সূত্রের খবর, শনি-রবিবার হলেই গজলডোবায় শয়ে-শয়ে বাইক, গাড়ির লাইন পড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা অনেকেই জানিয়েছেন, সে দিক থেকে দেখলে রাজ্য সরকার কিন্তু, গজলডোবাকেই শিলিগুড়ি শহরবাসীর বেড়ানো কিংবা বিনোদনের অন্যম জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। সেখানে গড়ে উঠতে পারে বড় মাপের কয়েকটি রেস্ট শেড। আধুনিক সুলভ শৌচাগার। নৌকাবিহার, ঘোড়ার গাড়ি সহ নানা খেলাধূলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অবশ্য সরকারি পরিকল্পনায় বড় মাপের গল্ফ কোর্স তৈরি হবে বলে উল্লেখ রয়েছে।
এখন সপ্তাহান্তে গজলডোবায় ছুটি কাটাতে যান যে শহরবাসীরা, তাঁদের অনেকেই জানিয়েছেন, প্রতি পদে সমস্যা পড়তে হয়। কারণ, আজও শিলিগুড়ি থেকে গজলডোবা সরকারি বাসের ব্যবস্থা হয়নি। সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলিতে সকাল থেকে সন্ধ্যে কয়েক দফায় শিলিগুড়ি-গজলডোবা রুটে ছোট মাপের বাস চালানোর দাবিও রয়েছে শহরবাসীদের মধ্যে। সেখানে পৌঁছনোর পরে দিনভর কাটানোর জায়গাও মেলে না। ভাল রেস্তোরাঁও তৈরি হয়নি।
গজলডোবার পরিকাঠামো তৈরিতে এখনও পর্যন্ত ১০০ কোটি টাকা খরচ করেছে রাজ্য সরকার। অথচ সরকার সেখানে সপ্তাহান্তে দিনভর বেড়ানোর ন্যূনতম ব্যবস্থা করতে পারল না কেন? কেনই বা আজও শিলিগুড়ি-গজলডোবা রুটে সরকারি পর্যায়ে বাস চালু করল না সরকার?
(চলবে)