প্রাচীর টপকে এক সঙ্গে হোম থেকে পালিয়ে যাওয়া পাঁচ তরুণীর মধ্যে এক জন এখনও নিখোঁজ।
শনিবার রাতে কোচবিহারের বাণেশ্বরে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার একটি স্বল্পকালীন সরকারি আবাসে ওই ঘটনা ঘটেছে। ওই রাতেই পুলিশ অবশ্য তাদের চার জনকে উদ্ধার করেছে। তবে রবিবার পর্যন্ত তাদের এক সঙ্গীর হদিস মেলেনি। সেই তরুণী গুয়াহাটির বাসিন্দা। একটি ট্রেন থেকে তাঁকে একা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে এই হোমে রাখা হয়েছিল। তিনি ট্রেনে বা বাসে অসমের দিকেই গিয়েছিন কি না, পুলিশ তার খোঁজ করছে।
গোটা ঘটনায় কোচবিহারের মহিলাদের হোমের নজরদারি ও পরিকাঠামো নিয়ে ফের বড়সর প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়েছে। কোচবিহারের একটি সরকারি হোমেও কিছু দিন আগে এক নাবালিকা ধর্ষণের জেরে অন্তঃসত্ত্বা হন বলে অভিযোগ উঠেছিল। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের জেলার আরও একটি হোমের আবাসিকদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় অস্বস্তি বেড়েছে প্রশাসনেরও। কেনই বা এত দিনেও সেখানে সিসিটিভি বসানো হয়নি তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বাণেশ্বরের ওই হোমের এক দিকে প্রায় আট ফুট উঁচু প্রাচীর রয়েছে। পেছনের দিকে ও অন্য পাশেও প্রায় পাঁচ ফুট উঁচু প্রাচীর রয়েছে। ওই প্রাচীরের উচ্চতা কিছুটা কম বলে কাঁটাতারও দেওয়া হয়েছে। হোমে ছয় কর্মী থাকলেও তাঁদের মধ্যে গড়ে দু’জন পাহারার দায়িত্বে থাকেন। তারপরেও কী ভাবে নজরদারি এড়িয়ে ওই প্রাচীর টপকে পাঁচ তরুণী এক সঙ্গে পালাল, তা দেখা হচ্ছে। ওই হোমের এক কর্তা জানান, বাথরুম আর রান্নাঘরের কাছের পাঁচিলটি নিচু। সেখানে কোনও বালতি বা টুল রেখে তার উপরে ভর দিয়ে পাঁচিল টপকায় এই পাঁচ জন।
এই পাঁচ জনের মধ্যে তিন জন অনাথ। তাঁদের সরকারি হোম থেকে এই হোমে আনা হয়েছে। এই তিন জনই কোচবিহারের রেলস্টেশন লাগোয়া জামাইবাজার এলাকা থেকে ধরা পড়ে। কখন কোন দিকের ট্রেন আসবে তার খোঁজ করছিলেন তাঁরা। অন্য জন ছিলেন কোচবিহারে। তিনি তাঁর বাড়ির ঠিকানা পুলিশকে বলতে পারেননি। তাঁরা কে কোথায় যেতে চেয়েছিলেন, তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
মূলত ১৬-৩৫ বছরের মহিলাদের ওই হোমে রাখা হয়। আবাসিকদের নাবালক সন্তানরাও বিশেষ অনুমতি নিয়ে থাকার সুবিধে পায়। বর্তমানে ওই হোমে ৩ জন নাবালক সহ ২৮ জন মহিলা হোমটিতে ছিলেন। শনিবার সন্ধ্যার পর তাঁদের মধ্যে ৫ জনকে নিজেদের ঘরে পাওয়া যাচ্ছিল না। হোমেরই অন্য কোথাও তাঁরা রয়েছেন ভেবে, সেখানে বেশ কিছু ক্ষণ খোঁজখবর করা হয়। কিন্তু তারপরেও ওই আবাসিকদের খোঁজ না মেলায় হোম কর্তৃপক্ষ পুরো ঘটনার কথা কোচবিহার কোতোয়ালি থানার পুলিশকে জানান। রাতেই রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড সহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিকদের খোঁজে তল্লাশি শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত কোচবিহার রেলস্টেশনের কাছে জামাইবাজার লাগোয়া এলাকা থেকে তিন জনকে উদ্ধার করে পুলিশ। বাণেশ্বর এলাকা থেকেই উদ্ধার হন আর এক জন। সকলেরই বয়স ২১-২৫ বছরের মধ্যে। কোচবিহারের পুলিশ সুপার সুনীল যাদব জানান, আবাসিকরা প্রাপ্তবয়স্ক।
গোটা ঘটনায় অস্বস্তিতে পড়েছেন হোম কর্তৃপক্ষ। হোমের সুপার শিউলি চৌধুরী বলেন, “ মাঝেমধ্যে নানা অছিলায় ওই আবাসিকরা বাইরে বেরোনর জন্য জোরাজুরি করত। তাই বলে এমনভাবে পাঁচজন পালিয়ে যাবে ভাবা যায়নি। রাতেই চারজন উদ্ধার হলেও একজনের খোঁজ না মেলায় উদ্বেগে রয়েছি।” হোম পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্তা বাবলু কার্জি বলেন, “ ২ জন কর্মীর নজর এড়িয়ে ওই আবাসিকরা প্রাচীর টপকে পালায়। গোটা বিষয়টি নিয়ে পরিচালন কমিটির বৈঠকে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কোচবিহারের জেলাশাসক পি উল্গানাথন বলেন, “একজন অতিরিক্ত জেলাশাসককে বিষয়টি দেখতে বলেছি। বিস্তারিত খোঁজখবর নিচ্ছি।” রাজ্যের বন উন্নয়ন নিগমের চেয়ারম্যান রবীন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, “পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি দেখছে। সিসিটিভি বসানোর ব্যাপারে জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলব।” পুলিশ ও হোম সূত্রে জানা গিয়েছে, কোচবিহারের বাণেশ্বরে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে ওই স্বল্পকালীন আবাসটি চলছে।
তবে আবাসিকদের জন্য সরকারের কিছু আর্থিক সাহায্য পান তাঁরা।