Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ জুন ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

হারিয়ে যাচ্ছে দিদিমা-ঠাকুমা, হারাচ্ছে পৌষপার্বণের অনেক পিঠেও

পৌষমাসের শেষ দিনটি পৌষসংক্রান্তি। এই তিনটি দিন বাঙালির পৌষপার্বণ তথা পিঠের পরব। বহুকাল ধরে এই দিনটি কৃষিজীবী বাঙালির বড় আনন্দের নতুন ধানের উ

রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
১৪ জানুয়ারি ২০১৭ ২০:৩১
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

পৌষমাসের শেষ দিনটি পৌষসংক্রান্তি। এই তিনটি দিন বাঙালির পৌষপার্বণ তথা পিঠের পরব। বহুকাল ধরে এই দিনটি কৃষিজীবী বাঙালির বড় আনন্দের নতুন ধানের উৎসব। প্রাচীন হিন্দুরা আগে এই দিনটিতে পরলোকগত পূর্বপুরুষ বা বাস্তুদেবতার উদ্দেশে পিঠে-পায়েস নিবেদন করতেন। এর ঠিক আগের দিন গ্রামবাংলার গেরস্তবাড়ির উঠোন পরিষ্কার করে নিকিয়ে সেখানে চালগুঁড়ি দিয়ে চমৎকার সব আলপনা দেওয়া হত। যার মধ্যে কুলো, সপ্তডিঙা মধুকর, লক্ষ্মীর পা, প্যাঁচা এবং অবশ্যই ধানের ছড়ার আলপনা বেশি প্রচলিত ছিল। মা লক্ষ্মী ঘরে আসবেন বলেই হয়তো করা হত এত তোড়জোড়। এ-বাংলায় এই আচারটিকে লোকায়ত ভাষায় আউনি-বাউনি পুজোও বলে।

Advertisement



হেমন্তে পেকে যাওয়া ধান কেটে গোলায় তোলার প্রতীক হিসেবে, কয়েকটি পাকা ধানের শিষ কিংবা এর অভাবে দু’-তিনটি খড় দিয়ে বিনুনি করে, ভক্তিভরে পুজো করে, গেরস্তবাড়ির বিভিন্ন জায়গায় সৌভাগ্যের চিহ্ন হিসেবে তাদের একটি করে নিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। ভাবা হয় এই ভাবেই সৌভাগ্য চিরতরে বাঁধা পড়ে থাকবে। অনেক সময় ধানের সঙ্গে নরম আমপাতা, রূপসী মুলোফুল বা স্নিগ্ধ হলুদ সরষেফুলও গেঁথে দেওয়ার চল আছে। এই বন্ধনের অবশ্যই আর একটি মানে হল ঘরের মানুষটিকে কিছু দিন ঘরের মধ্যেই বেঁধে রাখা। আর এটি বাঁধার সময় মুখে মুখে ছড়া কাটা হয়, ‘আউনি বাউনি চাউনি/তিন দিন কোথাও না যেও/ ঘরে বসে পিঠে-ভাত খেও।’ অবশ্য জায়গা বিশেষে এটি বদলে বদলেও যায়। এই ছড়াটির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অর্থের খোঁজ করতে গিয়ে বিশিষ্ট ভাষাতাত্ত্বিক কামিনীকুমার রায় বলেছেন, ‘আওনি— লক্ষ্মীর আগমন, বাওনি— লক্ষ্মীর বন্ধন বা স্থিতি আর চাওনি— তাঁহার নিকট প্রার্থনা।’



বাউনি-বাঁধার আগে তাই মাটির সরায় পিঠে ভাজতে হয়। পিঠে ভাজা শেষ হলে তা সেই সরার ওপর রেখে, তার ওপর মাটির তৈরি ঢাকনা চাপা দিয়ে, সেই ঢাকনার ছোট্ট-গোল মাটির হাতলকে বেড় দিয়ে প্রথম বাউনিটি বেঁধে দিতে হয়। তারপর তা বাঁধা হয় বাড়ির অন্যান্য জায়গায়। এটি বাঁধা হয় বাড়ির দরজার কড়ায়, গোলাঘরের আংটায়, ঢেঁকির খুঁটিতে, তোরঙ্গের চাবি-কব্জায় কিংবা সিন্দুকের হাতলে। বাড়ির হারমোনিয়ামের চাবির গোড়াতে এখনও এটি বাঁধা হয়ে থাকে। আমাদের ভবানীপুরের বাড়ির পিঠে-ভাজার পরবটি আমার স্মৃতিতে এখনও যেন মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে। প্রথমেই আমাদের রান্নাঘরের মাটির তৈরি ডাবল উনুনটিকে ভেজা কাপড় দিয়ে ভাল ভাবে পেড়ে নেওয়া হত। তারপর মোটামুটি মাঝারি আঁচ দেখে তাতে বসানো হত একটি গেরুয়া রঙের মাটির সরা। সরা কিছুটা তেতে এলে তাতে ছড়িয়ে দেওয়া হত কিছুটা নুন। তা আবার খানিক পরে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঝেড়ে ফেলেও দেওয়া হত। এ বার তাতে ছড়িয়ে দেওয়া হত সামান্য সাদা তেল। তখন আমাদের বাড়িতে একটিমাত্র সাদা তেলের চল ছিল— যার নাম ছিল পোস্টম্যান। ফিকে নীল রঙের লম্বাটে প্লাস্টিকের কৌটোর গায়ের সামনের দিকে এক জন খাকি পোশাক ও টুপি-পরা, ব্যাগ-কাঁধে পোস্টম্যানের ছবি আঁকা থাকত। আমি ক্লাস থ্রি-ফোর পর্যন্ত ভাবতাম সব পোস্টম্যানেরাই বুঝি এই তেলটি তৈরি এবং বিক্রি করেন।



আগে থাকতে আতপ চালের গুঁড়ো, গরম জল দিয়ে ঘন লেইয়ের মতো মেখে রাখা হত। তারপর হাতায় করে তা সেই সরার ওপর তিন-চারটি থোপায় ফেলে, সরার ঢাকা চাপা দিয়ে দেওয়া হত। খানিকক্ষণ ঢিমে আঁচে থাকার পর পিঠেগুলি সামান্য শক্ত হয়ে এলে, খুন্তি দিয়ে আলতো করে তাদের তলা থেকে তুলে নেওয়া হত এবং সেই সরাতেই আবার তিন-চারটি পিঠে ছাড়তে হত। সব পিঠে ভাজা হয়ে গেলে শেষে সরাটি উনুন থেকে নামানো হত। কারণ, ঠান্ডা হওয়ার সময় অনেক সময়েই তা ফট্‌ করে ফেটে যেতে পারে। এই পিঠেটির নাম সরা-পিঠে বা আস্‌কে পিঠে, যার স্বাদ হালকা নোনতা। তাই আমাদের বাড়িতে এটি নতুন ঝোলাগুড় দিয়ে খাওয়াই রীতি। আসলে এই শীতকালেই ঢেঁকিতে ধান ভাঙার সময় অনেক আতপচাল টুকরো হয়ে ভেঙে যেত। গোবিন্দভোগ বা কামিনীভোগের মতো আতপ চালের টুকরোকে আলাদা করে আরও খানিকটা ভেঙে, গুঁড়ো করে, তা দিয়ে নানা রকম সুস্বাদু পিঠে বানানোর প্রচলনটা তাই যথার্থ ছিল।



শীতকালই হল খেজুরগাছ থেকে টাটকা রস নামিয়ে নবীন খেজুর গুড় তৈরির সময়। তাই পৌষপার্বণে পিঠে পরবে নতুন গুড়ও অবশ্যম্ভাবী। আর কে না-জানে শীতকালই হল নারকেল ফলার পিক সিজন। পৌষসংক্রান্তি কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট দিনে হলেও পিঠে তৈরির ধুম চলে তার আগের দিন থেকে শুরু করে পয়লা মাঘ পর্যন্ত— মানে মোট তিন দিন। এই সময় পাতলা রুটির মতো পাটিসাপটা (ভেতরে ক্ষীরের পুর এবং নারকেলবাটার পুর, দু’রকমেরই হয়), পটলের মতো আকারের চিনি-নারকেলের পাক দেওয়া পুর-ভরা ভাজাপুলি, ঘন দুধে ভেজানো দুধপুলি, ক্ষীরে ডোবানো ও ভেতরে ক্ষীরের পুর-ভরা ক্ষীরপুলি, নারকেল-কোরা ও চিনির পুর দেওয়া মুগডালের সঙ্গে চালগুঁড়ি মিশিয়ে বানানো অনবদ্য মুগপুলি, একই ভাবে রাঙাআলু সেদ্ধ করে চালগুঁড়ির সঙ্গে মিশিয়ে বানানো রাঙাআলুর পুলি অত্যন্ত উপাদেয়। কখনও আবার চালের গুঁড়ির সঙ্গে সুজি মিশিয়েও পুলি বানানো হয়ে থাকে। ফুটন্ত জলের ভাপে তৈরি হওয়া ভাপাপুলি বা ফুটন্ত জলে সেদ্ধ হওয়া সেদ্ধপুলির ভেতরে সাধারণত ক্ষীর নয়, নারকেলের ছাঁই পোরা থাকে। এবং এদের গরম-গরম পয়রাগুড়ের ছোট পদ্মকাটা বাটিতে ডুবিয়ে খেতে বড় ভাল লাগে। তবে আর এক ধরনের অত্যন্ত ছোট ছোট পিঠে আছে। চালের গুঁড়িকে সামান্য গরমজল আর ঘি দিয়ে মেখে, হাতের তালুতে ঘষে ঘষে ফেললে অত্যন্ত ছোট্ট ছোট্ট আকারের এক-একটি পুলি তৈরি হয়। এদের নাম চুষিপিঠে। তৈরি হওয়ার পর এদের রোদে শুকিয়ে নিয়ে তারপর ঘন ক্ষীরের মধ্যে ফেলে ফুটিয়ে পায়েস তৈরি করতে হয়— যার স্বাদ হয় অপূর্ব। এটি তৈরি করা খুব সহজ কথা নয়। আমাদের সমাজ-সংসার থেকে পুরনো দিনের দিদিমা-ঠাকুমারা হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পিঠেটিও ডোডো পাখিদের মতোই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে!



(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement