Advertisement
E-Paper

কংগ্রেসের হাত ধরার সওয়াল সিপিএমের রাজ্য কমিটিতে

এর আগে গৌতম দেব কৌশলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এ বার বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার দরজা খোলার জন্য সরাসরি সওয়াল হল সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠকে। এবং দাবি খারিজ না করে দরকষাকষির শক্তি বাড়ানোর জন্য আগে সংগঠন ও আন্দোলনের শক্তি বাড়ানোর পরামর্শ দিলেন দলের রাজ্য সম্পাদক।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:৪৫
মঙ্গলবার আলিমুদ্দিনের বৈঠকে বুদ্ধ-বিমান-সূর্য। —নিজস্ব চিত্র

মঙ্গলবার আলিমুদ্দিনের বৈঠকে বুদ্ধ-বিমান-সূর্য। —নিজস্ব চিত্র

এর আগে গৌতম দেব কৌশলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এ বার বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার দরজা খোলার জন্য সরাসরি সওয়াল হল সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠকে। এবং দাবি খারিজ না করে দরকষাকষির শক্তি বাড়ানোর জন্য আগে সংগঠন ও আন্দোলনের শক্তি বাড়ানোর পরামর্শ দিলেন দলের রাজ্য সম্পাদক।

আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে যখন আসন্ন বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের বিরুদ্ধে কার্যকরী লড়াইয়ের স্বার্থে কংগ্রেসের সঙ্গে কৌশলগত সমঝোতার দাবি উঠছে, তখনই বিধানসভার ভিতরে হাতে-গরম একাধিক বিষয়ে একই সুরে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হলেন বাম ও কংগ্রেস বিধায়কেরা। চা-বাগানে মৃত্যুর মিছিল নিয়ে সিপিএম বিধায়ক মমতা রায়ের প্রশ্নে শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটকের জবাবে অসন্তুষ্ট হয়ে প্রতিবাদে ঝাঁপিয়ে পড়লেন কংগ্রেসের পরিষদীয় দলনেতা মহম্মদ সোহরাব, মানস ভুঁইয়ারা। আবার মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিক্ষকদের দুর্দশার প্রতি তৃণমূল সরকারের উদাসীনতার প্রতিবাদে সরব দেখা গেল দু’পক্ষকেই। বিধানসভা কক্ষ থেকে পরপর ওয়াকআউটও করলেন দু’দলের বিধায়কেরা। সব মিলে বিধানসভার ভিতরে-বাইরে বাম-কংগ্রেস নৈকট্যের ছবিই স্পষ্ট হয়ে উঠল মঙ্গলবার।

সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠকে এ দিন একের পর এক জেলার নেতারা জানিয়েছেন, জাঠা কর্মসূচি তাঁদের মনোবলে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। যেখানে গত সাড়ে বছরে ঘর থেকে বেরোতেও ভয় পেতেন বাম কর্মী-সমর্থকেরা, সেখানেও মিছিলে সাড়া মিলেছে। এই তৎপরতাকেই আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে সওয়াল করেন প্রাক্তন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়। সিপিএম সূত্রের খবর, বৈঠকে তিনি বলেন, জাঠা-মিছিলে সাড়া মিলছে, ভাল কথা। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়! তৃণমূল এবং বিজেপি-র হাত থেকে রাজ্যকে বাঁচাতে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা কেন হবে না, প্রশ্ন তোলেন তিনি। কান্তিবাবুর মতে, এই ধর্মনিরপেক্ষ বোঝাপড়াই সময়ের দাবি। দলের তত্ত্ব বা কৌশলের আড়ালে এমন সুযোগ এক বার হারালে বারবার তা ফিরবে না! রাজ্যের তৃণমূল-বিরোধী মানুষের চাহিদাকে সম্মান দেওয়ার জন্য দলীয় নেতৃত্বকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার আর্জি জানান প্রাক্তন বিধায়ক। এই সওয়ালের জন্য রীতিমতো ‘নোট’ তৈরি করে বৈঠকে এসেছিলেন তিনি।

Advertisement

বস্তুত, জাঠা-সহ সাম্প্রতিক নানা কর্মসূচিতে সাড়া মিললেও তৃণমূলের সঙ্গে সর্বত্র একক ভাবে লড়াই করার মতো জায়গায় বামেদের সাংগঠনিক শক্তি এখনও সংহত হয়নি, কয়েক দিন আগেই দলের রাজ্য কমিটির ওয়েবসাইটে এমন মন্তব্য করেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সেই অর্থে কান্তিবাবু এ দিনের বৈঠকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর যুক্তি ব্যবহার করেই আরও এক ধাপ এগিয়েছেন।

সদ্য ‘শিলিগুড়ি মডেলে’ সাফল্য পেয়ে আসা দার্জিলিঙের জেলা সম্পাদক জীবেশ সরকারও রাজ্য কমিটিতে পরোক্ষে সওয়াল করেছেন কংগ্রেসের জন্য দরজা খুলে রাখার পক্ষেই। কান্তিবাবুর মতো সরাসরি না হলেও তাঁর আর্জি ছিল রাজ্যের জন্য ‘বাস্তবোচিত’ সিদ্ধান্তের পক্ষে। সিপিএমের পার্টি কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয়েছিল কংগ্রেস এবং বিজেপি-র সঙ্গে সমদূরত্ব রাখার। সেই প্রসঙ্গ টেনেই জীবেশবাবু বৈঠকে বলেন, সারা দেশের সব রাজ্যে এই সিদ্ধান্ত একই ভাবে প্রযোজ্য হতে পারে না! কেরলে যা সত্যি, বাংলায় তা সত্যি নয়। তাই রাজ্যভিত্তিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রসঙ্গত, সিপিএমের কৌশলগত লাইন পর্যালোচনার দলিলেও রাজ্যওয়াড়ি সিদ্ধান্তের রাস্তা খোলা রাখা আছে।

রাজ্য কমিটির জবাবি ভাষণে দলের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র ফের বলেছেন, আপাতত তাঁরা সংগঠন ও প্লেনাম নিয়ে ভাবছেন। নির্বাচনী রণকৌশল নিয়ে আলোচনা শুরু হবে জানুয়ারি মাসে। দলীয় সূত্রের খবর, বৈঠকে সূর্যবাবুর বার্তা, প্রতিদিন নতুন ঘটনা ঘটছে এবং পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। কোন দল কার পাশে থাকছে এবং কে কার পাশ থেকে সরে যাচ্ছে, সেই ছবিও রোজ বদলাচ্ছে। তাই এখনই কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে পরে ঠকতে হতে পারে! তার চেয়ে পরিস্থিতি দেখে নিয়ে উপযুক্ত সময়েই নির্বাচনী কৌশল ঠিক হবে। আর তার আগে নিজেদের আন্দোলন জোরালো করতে হবে। দলের অন্দরে সূর্যবাবুর বক্তব্য, নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত না হলে অন্যেরা জোট করতে আগ্রহীই বা হবে কেন? যার অর্থ, দলের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির মতোই সমঝোতার জল্পনা উড়িয়ে দেননি রাজ্য সম্পাদকও।

বৈঠকের পরে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের বক্তব্য, ‘‘কংগ্রেসের সঙ্গে বোঝাপড়ার যুক্তি নিয়ে রাজ্য কমিটিতে এতটা সরাসরি কথা ওঠেনি আগে। তবে আমরা আগে ঘর গুছিয়ে তার পরে এই আলোচনায় ঢুকতে চাইছি। তাই জানুয়ারি মাস জুড়েই পথে নামার কর্মসূচি নিয়ে রাখা হয়েছে।’’ লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচির পাশাপাশিই জানুয়ারি থেকে বিধানসভা ভোটের প্রার্থীদের নাম ঠিক করার প্রক্রিয়া শুরু করে দেওয়ার জন্যও জেলা নেতৃত্বকে পরামর্শ দিয়েছেন সূর্যবাবু। তাঁর যুক্তি, জোটের ভাবনায় ঘর গোছানোয় ঢিলে দেওয়া চলবে না।

আন্দোলনের কর্মসূচিতেও এখন এক সূত্রে বাঁধা পড়ছে বাম ও কংগ্রেস! অনাহারে চা-বাগানের শ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে এ দিনই দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের দ্বারস্থ হয়েছিল প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর নেতৃত্বে দলীয় সাংসদদের একটি প্রতিনিধিদল। যন্তর মন্তরে চা-শ্রমিকদের নিয়ে আজ, বুধবার ধর্নায় বসতে চলেছেন অধীর, অমিতাভ চক্রবর্তী, মনোজ চক্রবর্তীরা। সেই ধর্নাস্থলে আসার কথা কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গাঁধীরও। আবার অনাহারে চা-বাগানে মৃত্যু নিয়ে এ দিন রাজ্য বিধানসভায় তুমুল বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন বাম ও কংগ্রেস বিধায়কেরা।

সিপিএম বিধায়ক মমতাদেবীর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রীর ওই বিবৃতির পরে কংগ্রেস পরিষদীয় দলনেতা সোহরাব চা-বাগানে একটি সর্বদল কমিটি পাঠানোর জন্য স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আবেদন জানান। কিন্তু সেই আবেদন নাকচ হওয়ায় কংগ্রেসের মানসবাবু শ্রমমন্ত্রীকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘‘আগের সরকারকেও দেখেছি অনাহারে মৃত্যুর কথা অস্বীকার করত। আপনারাও অস্বীকার করছেন! আপনি বলুন, চা-বাগানে মৃত্যুর মিছিল চলছে কি না?’’ সরাসরি উত্তর এড়িয়ে চা-শ্রমিকদের মৃত্যুকে ‘স্বাভাবিক’ বলে ফের দাবি করেন মলয়বাবু। বিরোধীদের চাপ সত্ত্বেও বারবার সরকারের এমন ‘অসত্য’ দাবিকে পরে ‘অসহিষ্ণুতা’ বলে কটাক্ষ করেন মানসবাবু।

প্রশ্নোত্তর-পর্বের উত্তেজনার পরে ফের সভায় গোলমাল শুরু হয় মাদ্রাসা শিক্ষকদের প্রতি রাজ্য সরকারের বঞ্চনার প্রতিবাদে। সিপিএমের আনিসুর রহমান এবং পরে কংগ্রেসের ফিরোজা বেগম মাদ্রাসা শিক্ষকদের নিয়োগ এবং তাঁদের সমস্যা মেটানোর দাবিতে মুলতবি প্রস্তাব আনেন। কিন্তু তা নিয়ে আলোচনার অনুমতি না মেলায় বাম বিধায়কেরা ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখান। কংগ্রেস বিধায়কেরা নিজেদের আসন থেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে কক্ষত্যাগ করেন। এর পরে বামেরাও একই পথ নেন। বিরোধী দলনেতা সূর্যবাবু সোমবারই বলেছিলেন, প্রতিবাদের বিষয় এক হলে কক্ষ সমন্বয়ই স্বাভাবিক। সেই সমন্বয়ের ছবি এ দিন বিধানসভা থেকে ছড়িয়ে পড়ল সভার বাইরেও!

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy