রাত ১২টা, শনিবার। ট্রেনের আসা-যাওয়া তখন স্টেশন দিয়ে বেশ কম। এরই মধ্যে রেলকর্তা, আরপিএফ, জিআরপি, সিআরপি, কলকাতা পুলিশের বিশাল বাহিনীর উপস্থিতিতে রেললাইন দিয়ে ট্রলিতে করে আনা হল বড় ক্রেন। মজুত বুলডোজ়ারও।— এমন আবহের মধ্যেই শিয়ালদহ, হাওড়ার পরে এ বার দমদম স্টেশন ও তার আশপাশে থাকা হকারদের ‘অবৈধ’ স্টল গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে থাকলেন সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটু-সহ অন্য সংগঠনের নেতৃত্ব। উত্তরপাড়া স্টেশন চত্বরেও হয়েছে উচ্ছেদ। প্রতিবাদে রবিবারের পাশাপাশি আজ, সোমবার রাজ্যের প্রতিটি স্টেশনে বিক্ষোভ, দাবিপত্র দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছে সিটু অনুমোদিত পশ্চিমবঙ্গ রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়ন। উচ্ছেদের ঘটনায় বিজেপির ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারকে নিশানা করেছে বামপন্থী বিভিন্ন দল, শ্রমিক সংগঠন, কংগ্রেস। হকারেরা কী ভাবে বসেছিলেন, সেই প্রশ্ন তুলে পুনর্বাসনের কথা ভাবা হবে বলে দাবি করেছেন বিজেপি নেতৃত্ব।
দমদমে রাতে হকার-উচ্ছেদ নিয়ে রেলের তৎপরতার মাঝেই সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রতিবাদ সংগঠিত করেছেন সিপিএমের প্রাক্তন সাংসদ তড়িৎবরণ তোপদার, দলের নেতা গার্গী চট্টোপাধ্যায়, ময়ূখ বিশ্বাস প্রমুখ। সিটু-র তরফে রেলের কাছে এক মাস সময় চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যেই চলেছে উচ্ছেদ অভিযান। গোটা স্টেশনে সব ছোট দোকান ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও চায়ের একটি পুরনো স্টলের পাশাপাশি রক্ষা পেয়েছে ‘গীতা প্রেসে’র স্টলটি। স্টেশনের বাইরেও সব ছোট দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়েই রবিবার হয়েছে বামেদের প্রতিবাদ মিছিল।
রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ অবশ্য স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলেছেন, “নেতাদের টাকা দিয়ে যে যেখানে ইচ্ছা বসে গিয়েছেন। এই অধিকার কেউ দেননি। এর দায় আমরা নেব কেন? সরকার তাঁদের (হকারদের) কথা ভাবছে, অন্য জায়গায় বসার ব্যবস্থা করবে। তবে আগে পরিষ্কার, পরে পুনর্বাসন। অর্ধেক লোক বাংলাদেশ থেকে এসে বসে গিয়েছেন। প্ল্যাটফর্ম আগে যাত্রীদের জন্য। তাঁদের দাঁড়ানোর জায়গা নেই।” রেল সূত্রে বক্তব্য, যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধা ও স্টেশনের সুরক্ষার স্বার্থেই এই অভিযান। যদিও স্টেশনের যে সব ছোট দোকান অজস্র নিত্যযাত্রীর ভরসা, সেই যাত্রীরা বা তাঁদের সংগঠন কবে দোকান নিয়ে অভিযোগ করলেন বা তুলে দেওয়ার দাবি করলেন, তার সদুত্তর মিলছে না।
সিটু নেত্রী গার্গী বলেছেন, “অনেক লড়াই করেও দোকান রক্ষা করা গেল না। কিন্তু এই লড়াই ভোলা যাবে না।” হকার্স ইউনিয়নের তরফে অলকেশ দাশ, দীপঙ্কর শীলদের অভিযোগ, ‘সদ্যগঠিত ডবল ইঞ্জিন সরকার গরিব রেল হকারদের রুটি-রুজি হরণের সঙ্গী হল।’ ঘটনার প্রতিবাদে এবং পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়, এই দাবিতে আজ এন্টালি মার্কেট থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত মিছিলের ডাক দিয়েছে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন। রেল হকার, রেল, রাজ্য সরকারের মধ্যে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করে সমাধান-সূত্র বার করার কথাও বলেছে সিটু। পাশাপাশি, সিপিআই (এম-এল) লিবারেশনের শ্রমিক সংগঠন এআইসিসিটিইউ-র রাজ্য সম্পাদক বাসুদেব বসুও বলেছেন, “আলোচনায় আধিকারিকেরা উচ্ছেদ অভিযান স্থগিতের প্রতিশ্রুতি দিলেন। অথচ, তার পরেই এই উচ্ছেদ প্রমাণ করল বর্তমান সরকার বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে গরিব মানুষকে উচ্ছেদ করতে মরিয়া।”
দমদম স্টেশন চত্বরে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ছোট ছোট দোকান। — নিজস্ব চিত্র।
স্থানীয় একটি সূত্রের বক্তব্য, হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে রাতে কোথাও বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠনকে দেখা যায়নি। উত্তরপাড়া স্টেশন সংলগ্ন মাছের বাজার ভেঙে উচ্ছেদের সময়েও রাতে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রতিবাদের চেষ্টায় ছিলেন বাম কর্মীরা। ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে প্রদেশ কংগ্রেস। বিজেপি, আরএসএস-বিরোধী সব দল, গণসংগঠনের কাছে এক জোট হয়ে লড়াইয়ের ডাক দিয়ে দমদমের ঘটনার প্রেক্ষিতে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেছেন, “রাজ্যের নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে থেকে চলছে বুলডোজ়ার রাজনীতি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন হকার উচ্ছেদের বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি এখন কেন উচ্ছেদকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন?” কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরীও বলেছেন, “রেলের উন্নয়নের নাম করে হকার-সহ গরিব মানুষের উপরে আঘাত নেমে আসছে। এটাই বাংলার পরিবর্তন? সরকার আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)