৩৩ বছর আগেকার কথা। পশ্চিমবঙ্গে তখন বামেদের রমরমা। এ রাজ্যে সংগঠনের জোরই ছিল না বিজেপির। ওই অবস্থাতেও গ্রাম পঞ্চায়েতের ভোটে পদ্মপ্রার্থী হয়েছিলেন বিমলচন্দ্র বোড়া নামে এক যুবক। ভোট শেষ হয়। কিন্তু বিজেপি প্রার্থী হওয়ার ‘সাহস’ দেখানোর ‘অপরাধে’ গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল বিমলকে।
তারও ১৮ বছর পর রাজ্যে বাম শাসনের অবসান হয়। কিন্তু তৃণমূল জমানাতেও নিজের বাড়ি ফেরার সাহস দেখাতে পারেননি ওই বিজেপি কর্মী। রাজ্যে প্রথম বার বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বিমলকে বরণ করে বাড়ি ফেরালেন স্থানীয় পদ্ম-বিধায়ক।
মাটির বাড়ির দাওয়ায় বসে বিমলের উদাসী দৃষ্টি। তিনি ফিরে গেলেন ১৯৯৩ সালের স্মৃতিতে। বিমলের বাড়ি বাঁকুড়ার ইন্দাস ব্লকের কুশমুড়ি গ্রামে। রাজনৈতিক বোধ তৈরি হওয়া থেকেই তিনি বিজেপির সমর্থক। বামেদের ভরা সময়ে প্রায় স্রোতের বিপরীতে গিয়ে পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থী হন তিনি। বিমলের কথায়, ‘‘নির্বাচন মিটতেই তৎকালীন শাসকদলের সন্ত্রাসের শিকার হয়ে ঘরছাড়া হতে হয়েছিল। বাড়ি ছেড়ে মাসের পর মাস ভবঘুরের মতো ছিলাম। এই শহর-ওই শহর ঘুরেছি। একটা সময়ে হুগলির আরামবাগের গোপীনাথপুর এলাকায় থিতু হই।’’ প্রৌঢ় জানান, হুগলির স্থানীয় এক বাসিন্দার বাড়িতে কাজ শুরু করেন তিনি। সেখানেই বিয়ে হয়। সংসার করেছেন। তবে সাংসারিক চাপেও রাজনীতি থেকে দূরে সরেননি। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পরেও কেন বাড়ি ফেরেননি? বিমলের অভিযোগ, সাহস হয়নি। সে সময়ে তাঁর এলাকায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীরা শাসকের সন্ত্রাসের সাক্ষী হয়েছেন। গত ৩৩ বছর নিজের গ্রামের মুখই দেখতে পাননি তিনি।
বিমলের কথা জানতেন ইন্দাসের বিধায়ক নির্মলকুমার ধাড়া। তিনিই বিমলকে বাড়ি ফেরানোর ব্যাপারে উদ্যোগী হন। সোমবার সন্ধ্যায় আরামবাগ থেকে বিমল ফেরেন পিতৃপুরুষের ভিটেতে। তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন বিধায়ক স্বয়ং। বিমলকে বাড়ি ফিরিয়ে বিধায়কের মন্তব্য, ‘‘যখন আমাদের কিচ্ছু ছিল না, তখন এঁরাই ছিলেন। এঁরা দলের সম্পদ। এই একনিষ্ঠ কর্মী বাম আমলে অত্যাচারিত হয়েছেন। তার পরে তৃণমূল সরকারের সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। প্রায় ৩৩ বছর নিজের বাড়ি ফিরতে পারেননি তিনি।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘আমাদের সরকার প্রতিষ্ঠার পর আজ আতঙ্কের পরিবেশ দূর হয়েছে। বিমলচন্দ্র বোড়াকে বাড়িতে ফেরার সাহস জুগিয়েছে এই পরিবেশই। আমরা শুধু তাঁকে স্বাগত জানিয়েছি গ্রামে।’’
আরও পড়ুন:
যৌবন কেটেছে প্রায় পালিয়ে। পৈতৃক বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কাকে যেন ফোন করলেন বিমল। কিছু ক্ষণ পরে বললেন, ‘তিন দশক...’ খানিক থেমে গিয়ে আবার বলতে থাকেন, ‘‘নিজের মাটি, নিজের গ্রাম ছেড়ে কে আর বাইরে থাকতে চায়? কিন্তু পরিস্থিতি বাধ্য করেছিল। প্রথমে বামেরা, তার পর তৃণমূল... সন্ত্রাসের জন্য গ্রামে ফেরার সাহস দেখাতে পারিনি। আজ নিজেদের মাটির বাড়িটা দেখে ভীষণ আনন্দ হচ্ছে।’’ গলা বুজে আসে বিমলের।