একশো দিনের কাজে ‘হাপা’ (ছোট পুকুর) খোঁড়ার কাজে নিযুক্ত সুপারভাইজ়ারের নাকি আট বছর আগে মৃত্যু হয়েছে। আবার, অন্য একটি হাপা খোঁড়ার কাজে যাঁদের মজুরি দেওয়া হয়েছে, সে তালিকায় রয়েছেন মৃতেরা! এমনকি, মজুরি প্রাপকদের তালিকায় রয়েছে তিন নাবালক স্কুলপড়ুয়ার নামও—এমন এক গুচ্ছ অভিযোগের তদন্তের দাবিতে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর ২ ব্লকের বিজেপি পরিচালিত নীলডি পঞ্চায়েতের মুচকুন্দা গ্রাম সংসদের বাসিন্দাদের একাংশ।
গণস্বাক্ষর করে তদন্তের দাবিতে গত সোমবার রঘুনাথপুর ২ ব্লক প্রশাসনে স্মারকলিপি দিয়েছেন বাসিন্দারা। তদন্তের দাবি জানিয়েছে ব্লক যুব তৃণমূলও। বিডিও (রঘুনাথপুর ২) অনমিত্র সোম বলেন, ‘‘ওই পঞ্চায়েতে একশো দিনের কাজে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার পরে, তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
পঞ্চায়েত প্রধান বিজেপির উমা বাউরির যদিও দাবি, ‘‘ছ’মাসের ছুটিতে ছিলাম। সবে কাজে যোগ দিয়েছি। ঘটনার বিষয়ে কিছু জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব।”
অভিযোগকারীদের দাবি, বঙ্কিম গঁরাই নামের এক ব্যক্তির জমিতে হাপা খোঁড়ার কাজ চলছে। সে কাজের সুপারভাইজ়ার হিসেবে নাম রয়েছে বঙ্কিম গঁরাইয়েরই। অথচ, ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে আট বছর আগে। বাসিন্দাদের প্রশ্ন, কী ভাবে পঞ্চায়েত এক মৃত ব্যক্তিকে সুপারভাইজ়ার হিসেবে নিযুক্ত করতে পারে।
অপর অভিযোগটি উঠেছে, বিপিন গঁরাই নামের এক ব্যক্তির জমিতে একশো দিনের কাজে হাপা খোঁড়াকে ঘিরে। ওই কাজে যাঁদের মজুরি দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যেও তিন মৃত ব্যক্তি রয়েছেন বলে অভিযোগ।
আরও অভিযোগ, মজুরি প্রাপকদের তালিকায় এমন তিন জনের নাম রয়েছে, যারা নবম থেকে একাদশ শ্রেণির ছাত্র এবং নাবালক। পাশাপাশি, ওই প্রকল্পে যাঁরা মজুরি পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে দু’জন কাশীপুর ব্লকের সুতাবই ও তিন জন চেলিয়ামা পঞ্চায়েতের করগালি গ্রামের বাসিন্দা। বাসিন্দাদের ক্ষোভ, যে এলাকায় কাজ হচ্ছে, সেখানকার শ্রমিকদের বঞ্চিত করে অন্য ব্লক ও পঞ্চায়েতের লোকজনদের কাজ দিয়েছে পঞ্চায়েত।
অভিযোগকারীদের অন্যতম মুচকুন্দা সংসদের বাসিন্দা হারাধন গঁরাইয়ের দাবি, দু’টি হাপা খোঁড়াতেই দুর্নীতি হয়েছে। তা আন্দাজ করার পরে, খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কার্যত পুকুর চুরি হয়েছে।
তাঁর কথায়, ‘‘মৃত ব্যক্তিকে সুপারভাইজ়ার নিয়োগ করা-সহ মৃত ও নাবালকদের নামে ভুয়ো জব-কার্ড তৈরি করে মজুরির টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমরা নথি দিয়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি।”
ঘটনাচক্রে, যে তিন মৃতের নামে মজুরির টাকা তোলার অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের এক জনের ছেলে মথন গঁরাইয়ের নাম জড়িয়েছে দুর্নীতির অভিযোগে। এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, মথনবাবু বিজেপির সমর্থক। যদিও মথনবাবু বলেছেন, ‘‘আমি কোনও দল করি না। যদি কেউ প্রমাণ করতে পারেন মৃতদের নামে টাকা তোলা হয়েছে, তা হলে ব্লক অফিসে গিয়ে দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেব।”
ব্লক যুব তৃণমূল সভাপতি স্বপন মেহেতার অভিযোগ, ‘‘বিজেপির দখলে থাকা বিভিন্ন পঞ্চায়েতেই সীমাহীন দুর্নীতি হচ্ছে। নীলডির ঘটনা তারই একটা। আমরা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছি।”
যদিও ওই ব্লকের একটি মণ্ডলের বিজেপি সভাপতি অসীম চট্টোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘যদি একশো দিনের কাজে দুর্নীতি হয়ে থাকে, তা হলে দোষীরা যে দলেরই হোক, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক প্রশাসন। তবে শুধু নীলডি নয়, আমরা চাই, ২০১১ থেকে ব্লকের সব পঞ্চায়েতের কাজের তদন্ত করুক প্রশাসন।’’