নির্বাচনী প্রচারে দেওয়াল লিখনে ছড়া ও ব্যঙ্গচিত্রের আকর্ষণ বরাবরই রয়েছে। কোন দলের ছড়া ভাল, কাদের ব্যঙ্গচিত্র নজরকাড়া, পথচলতি মানুষের সে দিকে নজর থাকেই। এ বারও নাগরিক সমস্যা, বেকারত্ব, দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি থেকে হিন্দুত্ব— ভোটের নানা হাতিয়ার নিয়েই ছড়া বেঁধেছে দলগুলি। এক দেওয়ালে কটাক্ষ শাণানো হলে, তার জবাব মিলেছে অন্য দেওয়ালে।
কাশীপুর বিধানসভায় বিজেপির দেওয়াল লিখন— ‘জন্ম যখন হিন্দু কুলে, ভোট দেব তাই পদ্ম ফুলে’। তারই যেন পাল্টা দেওয়াল লিখন বাঁকুড়ায়— ‘জন্ম যখন মানবকুলে, ভোট দেব তাই জোড়াফুলে’। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বিজেপির হিন্দুত্ববাদের জিগিরের পাল্টা তৃণমূল সচেতন ভাবে মানবকুল শব্দ নির্বাচন করেছে।
আদ্রায় দেওয়ালে বিজেপি লিখেছে, ‘আতা গাছে তোতা পাখি, ডামিল গাছে মউ, দুর্নীতিবাজ তৃণমূলকে ভোট দিও না কেউ’। বেকারত্ব নিয়েও দু’জেলার দেওয়ালে চোখে পড়ছে, ‘দরকার ছিল শিল্প, পিসি শোনালো লন্ডনের গল্প।যুবকেরা চাইল কাজ, দিদি বললো চপ ভাজ’। রাজ্যে পরিবর্তনের স্লোগান তুলে তার সঙ্গে সুকৌশলে রামের নামও জুড়ে দিতে দেখা গিয়েছে রঘুনাথপুরে বিজেপির দেওয়াল লেখায়। বিজেপি লিখেছে— ‘১৫ বছর চোরেদের দিলেন, ৩৫ বছর বাম। ৫টি বছর দিয়ে দেখুন, কেমন রাখে রাম’।
প্রচারে ছড়া ব্যবহারে পিছিয়ে নেই তৃণমূলও। তারা লিখেছে— ‘গ্যাসের দামে নিভেছে উনুন, মধ্যবিত্তের উঠছে নাভিশ্বাস। বাংলার মানুষ নেই চিন্তায়, দিদির উপরে আছে বিশ্বাস’। প্রচারে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায়শই উল্লেখ করেন, ‘পদ্ম ফুলে দিলে ছাপ, ঘরে ঢুকবে কেউটে সাপ’। সেই ছড়াও বাঁকুড়ায় দেখা গিয়েছে।
তৃণমূল ও বিজেপির ‘সেটিং’ তত্ত্বকে ছড়ায় তুলে ধরে প্রচারে নেমেছে সিপিএম-ও। লেখা হয়েছে, ‘‘পদ্ম ফুলের দোকানে সেই ঘাস ফুলেরই জিনিস, লোক দেখানো ভোটের লড়াই ২৬-এ হোক ফিনিস’। চোখে পড়ছে— ‘মিলে মিশে খুঁটে খায়, বুঝে গেছে জনতা। এ পাড়ার মোদী,আর ওপাড়ার মমতা’। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোট থেকেই বামেদের ভোটের বড় অংশ রাম অর্থাৎ গেরুয়া শিবিরের দিকে চলে যাওয়া নিয়ে জোর চর্চা চলে রাজনৈতিক মহলে। সেই প্রেক্ষিতেই এ বারে সিপিএম যে নিজেদের ভোট ধরে রাখতে মরিয়া,আদ্রায় এমন দেওয়াল লেখাও দেখা যাচ্ছে। লেখা হয়েছে, ‘সেটিং মানুষ বুঝেই গেছে, খেলা উঠেছে জমে। বামের ভোট বামেই যাবে, সবাই গেছে জেনে’।
এ বার দেওয়াল লেখায় ছড়ার দিকে ঝোঁক কেন বেড়েছে? তৃণমূল, বিজেপি বা বাম নেতৃত্বের দাবি, গুরুগম্ভীর বক্তব্য দিয়ে দেওয়াল লিখলে অনেকেই সে দিকে ঘুরেও তাকান না। তার বদলে ছোট ছোট ছড়ার মাধ্যমে স্বছন্দেই নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যকে বাসিন্দাদের সামনে উপস্থাপিত করা যায়।
সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান গৌরীশঙ্কর নাগের ব্যাখ্যা, ‘‘রাজনীতির সঙ্গে ছড়া বা কবিতার সরাসরি যোগ নেই। তবে রাজনীতি যখন জনপ্রিয় হতে চায়, মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে চায়, তখন তাকে উঁচু জায়গা থেকে নেমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগ স্থাপনে মেঠো ভাষার ছড়া, কবিতার সাহায্য নিতে হয়। বিকল্প আর কিছু নেই।’
নির্বাচনে ছড়ার শক্তিও কম নয়। গৌরীশঙ্কর মনে করাচ্ছেন অতীতে জনপ্রিয় হয়েছিল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে ওঠা ছড়া ভিত্তিক স্লোগান— ‘গলি গলি মে শোর হ্যায়, রাজীব গাঁধী চোর হ্যায়’-এর প্রসঙ্গ। তবে কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি, যে ঘটনা নিয়ে ওই ছড়া বাধা হয়েছিল, সেই বোফর্স কেলেঙ্কারির সঙ্গে রাজীবের সরাসরি যোগাযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)