কোথাও একশো দিনের কাজের প্রকল্প তো কোথাও প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা।গোটা বিধানসভা কেন্দ্র জুড়ে নানা এলাকায় সাম্প্রতিক সন্ত্রাসের জেরে এ ভাবেই আটকে যাচ্ছে উন্নয়নের কাজ। সেই অভিযোগ তুলে এ বার তারই প্রতিকার চেয়ে পুলিশ-প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি-সদস্য, পঞ্চায়েতের প্রধান, উপপ্রধান-সহ নানুরের বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিদের একটা বড় অংশ। সোমবার তাঁরা দেখা করলেন নানুরের বিডিও এবং থানার ওসির সঙ্গে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ওই জনপ্রতিনিধিদের প্রত্যেকেই শাসকদল তৃণমূলের প্রতিনিধি। এবং এলাকার রাজনীতিতে তাঁদের অবস্থান বরাবর নানুরের দাপুটে তৃণমূল নেতা কাজল শেখের দিকে বলেই স্থানীয় বাসিন্দারা জানেন। যা দেখে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত, তৃণমূলের অনুব্রত গোষ্ঠীর হাতে কিছুটা ‘কোণঠাসা’ হয়ে থাকা কাজল পুলিশ-প্রশাসনের উপরে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতেই তাঁর অনুগামীদের একসঙ্গে ময়দানে নামাতে বাধ্য হলেন।
ঘটনা হল, নানুর ও বোলপুরের নানা এলাকায় দু’পক্ষের মধ্যে লাগাতার গোষ্ঠী সংঘর্ষের এই আবহেই রবিবার সন্ধ্যায় এলাকায় কাজল অনুগামী হিসাবে পরিচিত নানুরের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ সৈয়দ আমিন আলি এবং তৃণমূল কর্মী সমীর শেখের বাড়িতে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল ঘনিষ্ঠ বিধায়ক গদাধর হাজরার অনুগামীদের বিরুদ্ধে। সোমবার অবশ্য আমিন আলির বাড়িতে গিয়ে তালা ঝুলতে দেখা যায়। ভাঙচুরের তেমন চিহ্ন মেলেনি সমীর শেখের বাড়িতে। তাঁর স্ত্রী ফেন্সি বিবি বলেন, ‘‘ওরা আমার স্বামীর খোঁজে এসেছিল। বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি চালিয়ে গিয়েছে। এ সবের জেরে আমার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছেলের পড়াশোনা মাথায় উঠেছে।’’ এ দিনই আবার ওই কৃষি কর্মাধ্যক্ষ অভিযোগ করেন, সকালে গদাধরের লোকেরা তাঁর ছ’মাসের শিশু, স্ত্রী এবং বৃদ্ধা শাশুড়িকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে তাঁরা এখন আত্মগোপন করে রয়েছেন।
এ দিন নিরাপত্তার দাবিতে হামলার প্রতিবাদে বিডিও অফিস এবং থানায় বিক্ষোভ দেখাতে হাজির হন কাজল অনুগামী স্থানীয় ৭টি পঞ্চায়েত এলাকার প্রায় শতাধিক জনপ্রতিনিধি। প্রত্যেকেরই চোখে মুখে অবশ্য সন্ত্রস্ত ভাব ছিল স্পষ্ট। মনের কথা বলতে গিয়ে কেউ-ই নিজের নাম আর মুখে আনতে চান না। আবার অনেকেই নিজের পরিচয় দিলেও মুখে কোনও কথা বলতে চান না। এ দিন বিডিও-র কাছে তাঁরা বিধায়কের অনুগামীদের নানা হুমকির জেরে স্বাধীন ভাবে কোনও কাজ করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন।
নওয়ানগর-কড্ডা পঞ্চায়েতের উপপ্রধান মহম্মদ হাসিবুল হোসেনের অভিযোগ, গদাধর হাজরার অনুগামীদের বাধায় এলাকায় ১০০ দিন কাজের প্রকল্প এবং জেলা পরিষদের প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার একটি রাস্তা নির্মাণে কাজ থমকে গিয়েছে। একই অভিযোগ করে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহিলা প্রধান বলেন, ‘‘এলাকায় শান্তিতে কোনও কাজ করতে পারছি না। অথচ মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছি না। কিছু বললেই হয়তো দেখব আমার বাড়িতেও হামলা হয়ে গিয়েছে। এ দিনও ব্লক অফিসে আসার সময় বিধায়কের অনুগামীরা আমাদের আটকে দেয়। পরে ঘুরপথে গোপনে আমাদের এখানে আসতে হয়েছে।’’ এমনকী, দলেরই বিধায়ক অনুগামীদের অত্যাচারে নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন বলে বিডিও এবং ওসিকে জানিয়েছেন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি চিন্তা মাঝিও।
ওই সব জনপ্রতিনিধিরা এ দিন একযোগে জানান, তাঁরা বিডিও-র কাছে নিরাপত্তার পাশাপাশি সুস্থ ভাবে কাজের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় তাঁরা গণইস্তফা দিতে বাধ্য হবেন। বিডিও মৃণালকান্তি বিশ্বাস পরে জানান, ওই জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের কিছু সমস্যার কথা বলতে এসেছিলেন। তাঁদের লিখিত ভাবে তা জানাতে বলা হয়েছে। তা পেলে ব্লক প্রশাসন পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে। অন্য দিকে, এলাকায় সন্ত্রাস চালানোর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলেই দাবি করেছেন গদাধর। তাঁর আরও দাবি, ‘‘ওই কর্মাধ্যক্ষের বাড়িতে হামলার কোনও ঘটনাই ঘটেনি। আর এ দিন যাঁরা বিডিও অফিস বা থানায় ওই সব কথা বলেছেন, তাঁদেরও চাপ দিয়েই তা বলানো হয়েছে।’’
এ দিকে, পুলিশ জানিয়েছে, ৯ জনের বিরুদ্ধে কর্মাধ্যক্ষের বাড়িতে হামলা চালানোর অভিযোগ জমা পড়েছে। তদন্ত শুরু হয়েছে। শাসকদলেরই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে এমন খুল্লামখুল্লা বিতণ্ডা দেখে কটাক্ষ করতে ছাড়ছে না বিরোধীরা। সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তথা এলাকার প্রাক্তন সাংসদ রামচন্দ্র ডোমের প্রতিক্রিয়া, ‘‘তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদেরই যদি এই হাল হয়, তা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? তৃণমূলের আমলে সাধারণ মানুষকে যে উলুখাগড়ার মতো দিন কাটাতে হচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!’’