মামুলি সর্দি-কাশি থেকে জ্বর। এবং শেষে মৃত্যু। জামশেদপুরের এক বেসরকারি হাসপাতালে এক বধূর মৃত্যু পুরুলিয়ার শহরে উস্কে দিয়েছে ডেঙ্গি-জল্পনা।
যে হাসপাতালে মারা গিয়েছেন চন্দ্রাণী রায় (৪৭), সেটির ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয়েছে ‘ডেঙ্গি হেমারেজিক ফিভার’ এবং ‘ডেঙ্গি শক সিন্ড্রোম’। পুরুলিয়া জেলা স্বাস্থ্য দফতরও জানিয়েছে, ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েই ওই বধূর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে খবর মিলেছে। তবে জামশেদপুরে প্রথম যে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল চন্দ্রাণীদেবীকে, সেটির বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগও তুলেছেন মৃতার স্বামী।
শহরের নর্থ লেক রোডের শিবমন্দির লেন এলাকার বাসিন্দা চন্দ্রাণীদেবী জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকেই সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁর স্বামী বিকাশ রায় জানান, দু-এক দিনে না সারায় স্থানীয় স্থানীয় চিকিৎসককে দেখানো হয়। তিনি ওষুধপত্র দেন। কিন্তু দিন কয়েকের মধ্যে জ্বর আসে। তখন পুরুলিয়া থেকেই রক্ত পরীক্ষা করানো হয়। চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট দেখিয়ে ওষুধও বদলানো হয়। বিকাশবাবুর কথায়, ‘‘কিন্তু জ্বর সারছিল না। তখন অন্য একটি ল্যাবরেটরি থেকে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে ফের ওষুধ বদলানো হয়। ওষুধ খেলে জ্বর কিছুটা কমছিল। ফের জ্বর বেড়ে ১০২ ডিগ্রির কাছাকাছি চলে যাচ্ছিল।’’
জ্বর কমছে না দেখে বিকাশবাবু গত ১১ অগস্ট স্ত্রীকে জামশেদপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন। তাঁর অভিযোগ, কয়েক দিন কেটে যাওয়ার পরেও চন্দ্রাণীদেবীর শারীরিক অবস্থার কোনও উন্নতি হচ্ছিল না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ম্যালেরিয়া, টায়ফয়েড-সহ নানা ধরনের পরীক্ষা করেও তেমন কিছু মিলছে না বলে জানিয়েছিলেন। বিকাশবাবু বলেন, ‘‘তখন আমরাই ডেঙ্গির পরীক্ষা করতে বলি। প্রথমে আমল না দিলেও পরে হাসপাতাল আমার স্ত্রীর ডেঙ্গির পরীক্ষা করায়। আমাদের জানানো হয়, পরীক্ষায় ডেঙ্গির জীবাণু মেলেনি। কিন্তু আমার স্ত্রীর অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছিল। সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না সন্দেহ করে এক প্রকার জোর করেই নিজের দায়িত্বে স্ত্রীকে ওখান থেকে রিলিজ করিয়ে জামশেদপুরেই অন্য এক চিকিৎসককে দেখাই গত ১৬ তারিখ।’’
ওই চিকিৎসকই রোগের উপসর্গ দেখে বলেন, চন্দ্রাণীদেবী ডেঙ্গিতে আক্রান্ত এবং অবস্থা আশঙ্কাজনক। তখন জামশেদপুরেই অন্য একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় ওই মহিলাকে। বিকাশবাবুর আক্ষেপ, ‘‘তবু বাঁচানো গেল না। বুধবার রাত আটটা নাগাদ এই হাসপাতালেই মারা যায়। আগে যেখানে ভর্তি করেছিলাম, তারা একটু তৎপর হয়ে ডেঙ্গির পরীক্ষা নিরীক্ষা করলে স্ত্রীকে হয়তো হারাতে হত না।’’
সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ার আগে চন্দ্রাণীদেবী বাইরে কোথাও যাননি বলেও জানিয়েছে তাঁর পরিবার। শিবমন্দির লেনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই এলাকায় পিছনের দিকে জল জমা হয়ে রয়েছে বেশ কিছুদিন হল। দেশবন্ধু রোডে একটি বহুতল আবাসন ও শপিং মল তৈরি হয়েছে কিছুদিন আগে। সেই বিল্ডিংয়ের ব্যবহৃত জল ও অন্য নোংরা জল এসে এই এলাকার পিছনের দিকে একটি খোলা জমিতে জমা হচ্ছে। চন্দ্রাণীদেবীর মেয়ে শ্রীপর্ণা রায় বলেন, ‘‘মা এলাকার অন্য মহিলাদের নিয়ে এই জমা জল যাতে এই এলাকায় জমতে না পারে, তার জন্য পুরসভাতে গিয়েছিল। এলাকার মহিলাদের বলেছিল সরব হতে। কিন্তু অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি।’’ স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, জমা জলের জন্য ইদানীং এত মশার উপদ্রব বেড়ে গিয়েছে যে জানালা খুলে রাখা যাচ্ছে না।
স্থানীয় কাউন্সিলর মিতা চৌধুরী বলেন, ‘‘এটা ঠিক ওই মহিলা এই জমা জল নিয়ে সরব ছিলেন। আমি নিজেও ওঁর সঙ্গে পুরসভায় গিয়েছি। কিন্তু যে জমি দিয়ে জল পার হয়ে নর্দমায় পড়ার কথা, সেটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। জমি নিয়ে কিছু সমস্যাও রয়েছে। সে কারণেই জল জমে যাচ্ছে।’’ পুরুলিয়ার উপ-পুরপ্রধান সামিমদাদ খানের দাবি, তাঁরা ডেঙ্গি নিয়ে শহরবাসীকে সতর্ক করছেন। মশা মারা কামানও নিয়মিত শহরে টহল দিচ্ছে। ওই জমা জলের সমস্যা কী ভাবে সুরাহা করা যায়, তা তিনি দেখবেন বলে জানিয়েছেন।
জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অনিল দত্ত বলেন, ‘‘প্রথমিক ভাবে খবর পেয়েছি, ওই মহিলা ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েই মারা গিয়েছেন ঝাড়খণ্ডের হাসপাতালে। শুনেছি রিপোর্টে ডেঙ্গি পজিটিভ রয়েছে।’’ দফতরের পক্ষ থেকে মহিলার বাড়িতে গিয়ে এবং যে এলাকায় জল জমা হয়ে রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।