দলীয় নেতা খুনের দেড় বছর পরে ধৃত তৃণমূল নেতার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে ছ’ দিন পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিল আদালত। নেতার নাম নিমাই দাস।
সরকারি আইনজীবী ফিরোজকুমার পাল বলেন, “মহাদেব রায় খুনের ঘটনায় বুধবার নিমাই দাসকে আদালতে তোলে পুলিশ। বোলপুরের এসিজেএম রাজেশ গুহরায় ধৃতের জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে, ছয়’ দিন পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন। এপ্রিল মাসের চার তারিখ ফের তাঁকে আদালতে তুলবে পুলিশ।”
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নিজের বাড়ির অদূরেই খুন হন বোলপুর ব্লকের সর্পলেহণা-আলবাঁধা পঞ্চায়েতের তৃণমূল নেতা মহাদেব রায়। ওই পঞ্চায়েতের সর্বানন্দপুরের বাসিন্দা বছর চল্লিশের মহাদেব রায়ের রক্তাক্ত দেহ পাওয়া গিয়েছিল গ্রাম লাগোয়া কলহরপুর রাস্তায়। ওই ঘটনায় নিহতের পরিবারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছে ১৭ জন। সকলে জামিনে আছেন।
ফিরোজবাবু এ দিন বলেন, “এফআইআরে নাম না থাকলেও, মহাদেব রায় খুনের ঘটনার অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করে, নিমাই দাসের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে বলে আদালতে জানিয়েছ পুলিশ। তাই তদন্তের জন্য, তাঁকে হেফাজতে নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করতে বিচারকের কাছে আর্জি জানিয়েছিল। ধৃতের জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেছি। বিচারক পুলিশ হেফাজতের আর্জি মঞ্জুর করেছেন।” ধৃত তৃণমূল নেতা নিমাই দাসের পক্ষে এ দিন বোলপুরের এসিজেএম আদালতে জামিনের আর্জি জানান আইনজীবী কার্ত্তিক চক্রবর্তী। স্বাভাবিক ভাবেই অস্বস্তিতে তৃণমূল। আদালত চত্বরে ধৃত নিমাই দাস বলেন, “আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। এই বিষয়ে যা বলার দল বলবে।”
দলের তরফে জেলা সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল অবশ্য বলেন, ‘‘এ নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না।’’
কেন বছর দেড়েক পরে, আচমকা গ্রেফতার হলেন নিমাই?
বিরোধীদের পাশাপাশি দলের একাংশের দাবি, সামনে পঞ্চায়েত নির্বাচন। গত বিধানসভা নির্বাচনে, দলের কাছে প্রাপ্য সম্মান মেলেনি নিমাই শিবিরের। আর তাই সেই নির্বাচনে নিরপেক্ষ থাকা এবং বিরোধী সিপিএমকে মদত দেওয়ার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। অন্যদিকে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিক্ষুব্ধ প্রার্থী হৃদয় ঘোষের বাবা সাগর ঘোষ খুনের ঘটনায় নাম জড়ায় তৃণমূলের জেলা সভাপতির। ওই মামলায় মুখ পুড়েছিল তৃণমূলেরও। জেলা তৃণমূলের তাবড় নেতাদের এমন ভোগান্তির পিছনে, নিমাই দাসের প্রচ্ছন্ন মদতের কথা উঠে এসেছিল দলীয় তদন্তে।
পঞ্চায়েত ভোটে বিক্ষুব্ধ হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করে স্থানীয় কসবা পঞ্চায়েতের দখল নিয়েছিল নিমাই শিবির। প্রধান হয়েছিলেন নিমাই দাসের স্ত্রী শঙ্করি দাস। হাজারো কর্মী-সমর্থক নিয়ে বিজেপি শিবিরে নাম লেখান নিমাই। এবং সে সময় বিজেপির একাংশের দাবি ছিল, পাড়ুই থানা এলাকার চৌমণ্ডলপুর, মাখড়া, সাত্তোর-সহ আশেপাশের এলাকায় বিজেপির সংগঠন বাড়ানোর পিছনে অন্যতম কারিগরও ছিলেন নিমাই দাসই। কিন্তু বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে, বিজেপি ছেড়ে অনুব্রতের হাত থেকে পতাকা নিয়ে তৃণমূলে যোগ দেন নিমাই দাস ও হৃদয় ঘোষ।
কিন্তু দলের সংগঠনের দায়িত্বে না থাকায় এক রকমের নিরপেক্ষ ছিলেন নিমাই। এমনকী নির্দলের বলা ভাল বিজেপির দখলে থাকা কসবা পঞ্চায়েতে অনাস্থা এনেছিল তৃণমূল। পঞ্চায়েতের প্রধান ধৃত নেতা নিমাই দাসের স্ত্রী শঙ্করী দাসের বিরুদ্ধে অনাস্থায় জিতে প্রধান হয়েছেন তৃণমূলের সদস্য বিরাজুল শেখ। দলের সঙ্গে চিড় ধরে সেখানেও।
হালে চার রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের সফলতায়, পাড়ুইয়ে বিজয় মিছিলের আয়োজন করেছিল বিজেপি। দলের এক নেতার কথায়, আগের মতো ততটা সাংগঠনিক ক্ষমতা নেই ঠিকই। কিন্তু পঞ্চায়েত নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের পাড়ুই থেকেই সাংগঠনিক শক্তি জোরদার করতে চাইছে দল। এবং তৃণমূলের একাংশের দাবি, ফের বিজেপি শিবিরে নাম লিখিয়ে, শাসক দল তৃণমূলকে যাতে অস্বস্তিতে না ফেলেন তার জন্য এমন মোক্ষম চাল দিয়েছেন জেলা নেতৃত্ব।
শঙ্করী দাস বলেন, “বিজেপি শিবিরে যোগ দিচ্ছে কি না জানতে চেয়ে জেলা পুলিশের এক কর্তা থেকে শুরু করে দলের অনেকেই খোঁজ নিচ্ছিলেন। তৃণমূলে ছিলাম, আছি ও থাকবো বলে আমরা স্পষ্ট জানিয়ে ছিলাম। তা সত্বেও, মিথ্যা মামলায় কেন ফাঁসানো হল বুঝতে পারছি না। জেলা শীর্ষ নেতৃত্বকে জানিয়েছি।”