Advertisement
E-Paper

নোটের খোঁজে হন্যে

কোথায় গেলে পাওয়া যাবে টাকা! শনিবারও এই একটি প্রশ্নেই ঘুরপাক খেলেন দুই জেলার বহু মানুষ। কোথাও দুপুর গড়াতেই মুখের সামনে বন্ধ হয়ে গেল ব্যাঙ্কের দরজা। কোথাও আবার দিনভর ঘুরে একটি এটিএমও খোলা পাওয়া গেল না।

শেষ আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৬ ০০:৩০
বিষ্ণুপুরের মুখ্য ডাকঘরে টাকা জমা নেওয়া হলেও বদলে দেওয়া হল না। টাকা তোলাও গেল না। শিশুকে নিয়েই ডাকঘরে মা।

বিষ্ণুপুরের মুখ্য ডাকঘরে টাকা জমা নেওয়া হলেও বদলে দেওয়া হল না। টাকা তোলাও গেল না। শিশুকে নিয়েই ডাকঘরে মা।

কোথায় গেলে পাওয়া যাবে টাকা! শনিবারও এই একটি প্রশ্নেই ঘুরপাক খেলেন দুই জেলার বহু মানুষ। কোথাও দুপুর গড়াতেই মুখের সামনে বন্ধ হয়ে গেল ব্যাঙ্কের দরজা। কোথাও আবার দিনভর ঘুরে একটি এটিএমও খোলা পাওয়া গেল না। এ দিকে সংসার খরচের টাকা জোগাড়ে জেরবার মধ্যবিত্ত। যদিও সমস্যা সমাধান কবে, সদুত্তর নেই ব্যাঙ্ক, ডাকঘরেও। শনিবার সমস্যার ছবি খুঁজে দেখল আনন্দবাজার।

বন্ধ এটিএম

শনিবারও দরজা খুলল না দুই জেলার অধিকাংশ এটিএমের। এ দিন পুরুলিয়া শহর ও শহরতলির প্রায় ৮০টির এটিএমের মধ্যে খোলা ছিল হাতে গোনা পাঁচ-ছ’টি। শহরের ব্যস্ত এলাকা হাসপাতাল মোড়, রেলস্টেশন, সাহেববাঁধ রোড, মেনরোড-সহ শহরের মূল জায়গার বেশিরভাগ এটিএমের দরজাই ছিল বন্ধ। হাসপাতাল মোড়ের একটি এটিএম কাউন্টারের বাইরে এ দিনও ‘নো ক্যাশ’ বোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। টোটো থেকে নেমে এটিএমের কাছে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে দেখা গেল রঘুনাথপুরের বেড়ো গ্রাম থেকে টাকার সন্ধানে আসা স্বপন বাউরিতে। তাঁর খেদ, ‘‘আমাদের এলাকায় কোনও এটিএম খোলা নেই। রবিবার ছেলেকে বাঁকুড়ায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাব। তাই টাকা তুলতে এসে সব জায়গায় ঘুরলাম। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না।’’

বিপাকে ব্যাঙ্ক

বাতিল হওয়া নোট জমা নিয়ে রাখতে গিয়ে সমস্যায় পড়ল বিষ্ণুপুরের সমবায় ব্যাঙ্ক টাউন কো-অপারেটিভ। ওই ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান শ্যামাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, গত দু’দিনে প্রায় দু’কোটি টাকা বাতিল হওয়া নোট লোকজন তাঁদের সমবায় ব্যাঙ্কে জমা করেছেন। এ দিকে, তাঁদের ব্যাঙ্কের ভল্টে ৭০ লক্ষের বেশি টাকা রাখার নিয়ম নেই। শ্যামাপ্রসাদবাবু বলেন, “বাড়তি টাকা শহরের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কেই আমরা রাখি। কিন্তু শনিবার ওই ব্যাঙ্কে টাকা রাখতে গেলে তাঁরা টাকা জমা করতে চায়নি। আমাদের জমা টাকাও তারা দিতে চাইছে না। বড় বেকায়দায় পড়ে গিয়েছি আমরা।’’ পরে একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে তাঁরা বাড়তি টাকা রাখেন। ওই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ অবশ্য বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।

ব্যাঙ্কের আর্জি

মধ্যবিত্তের ঘরে-ঘরে হাতটান অবস্থা। ব্যাঙ্কে গিয়ে দিনভর অপেক্ষা করেও টাকা না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে বহু মানুষকেই। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের রোষ কিছু কিছু জায়গায় আছড়ে পড়ছে ব্যাঙ্ক কর্মীদের উপর। এই পরিস্থিতিতে অল ইন্ডিয়া ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের বাঁকুড়া জেলা সম্পাদক সাগর রায়ের অনুরোধ, “জনসাধারণকে পরিষেবা দিতে সব ব্যাঙ্কের কর্মীরা যারপরনাই খাটছেন। কিন্তু সব জায়গায় টাকার জোগান যথেষ্ট নয়। ব্যাঙ্ককর্মীদের লোকজনের কথা শুনতে হচ্ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যদি চাহিদা মাফিক টাকার জোগান দিত, তাহলে হয়তো জনতার ভোগান্তি এতটা হতো না। তাই সবার সহযোগিতা চাই।’’

পুরুলিয়ার হাসপাতাল মোড়ে বন্ধ এটিএম। নোটিস দেখে ফিরে গেলেন বাসিন্দারা।

তেল শেষ

ভিড় কাটিয়ে ব্যাঙ্কে ঢোকা দায়। এটিএমগুলির অবস্থাও একই। বিষ্ণুপুর শহরে মোটে একটি এটিএম চালু, বাকি সব বন্ধ। পকেটে ছিল একটি ৫০০ টাকার বাতিল হয়ে যাওয়া নোট ও গোটা পঞ্চাশেক টাকা। এই পরিস্থিতিতে চালু এটিএমের খোঁজ করতে শুক্রবার সকালেই মোটরবাইকে সেই ৫০০ টাকার পেট্রোল ভরে বিষ্ণুপুর শহর ও শহর সংলগ্ন নানা এলাকা চষে বেড়িয়েছেন কৃষ্ণগঞ্জ কামারপাড়ার যুবক শুভ্র রক্ষিত। কিন্তু শনিবারেও দ্বিতীয় কোনও চালু এটিএম নজরে আসেনি। তাঁর আক্ষেপ, “টাকার খোঁজে দু’দিন ধরে মোটরবাইক নিয়ে চষে বেড়ালাম। টাকা তো জুটলই না। উল্টে মোটরবাইকে যা পেট্রোল ভরেছিলাম সেটাও গেল ফুরিয়ে!’’

হঠাৎ বন্ধ

বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ আচমকা বন্ধ হয়ে গেল হুড়ার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের দরজা। বাইরে তখনও অনেক মানুষ লাইনে। ঝাঁপ বন্ধ হতেই বাইরে অপেক্ষারত মানুষজন ফেটে পড়লেন ক্ষোভে। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এ দিন শনিবার তাই নির্দিষ্ট সময়েই বন্ধ হয়েছে। বাইরে লাইনে থাকা হুড়ার মতিপুর গ্রামের বাসিন্দা সুকুমার মাহাতোর ক্ষোভ, দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ৪টের সময় যে বন্ধ করে দেওয়া হবে, আগাম তো জানানো হয়নি।

কাউন্টার কম

বাইরে কয়েকশো লোক রাস্তার উপরে ঠায় দাঁড়িয়ে। ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন কেউ কেউ। কিন্তু ব্যাঙ্কের ভিতরে দু’টি কাউন্টারের মধ্যে একটিতে টাকা জমা এবং অন্য একটি কাউন্টার থেকে টাকা তোলা হচ্ছে। এই সময়ে বাড়তি কাউন্টার কেন খোলা হয়নি, তা নিয়ে গজগজ করছিলেন মানবাজারে ব্যাঙ্ক পাড়ার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের গ্রাহকদের কয়েকজন। এক ব্যাঙ্ক কর্মীর অসহায় স্বীকারোক্তি, ‘‘আমাদের ব্যাঙ্কে কর্মীর সংখ্যা কম। বাড়তি কাউন্টার খুলব কী করে!’’ সেই সঙ্গে তাঁর আশ্বাস, ‘‘আমরা অবশ্য দ্রুত কাজ সারছি। দেরি হবে না।’’ সেই আশ্বাস নিয়েই আরও কিছুটা ভরসা পেয়ে কিছুটা ঠান্ডা হলেন গ্রাহকেরা।

টোকেন পেয়ে

আগের দিন লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে ফিরে গিয়েছিলেন। শনিবার তাই সকালেই লাইনে দাঁড়ানো মানুষজনের জন্য টোকেনের ব্যবস্থা করেছিলেন হুড়ার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক। লাইনে দাঁড়ানো লোকেরা টোকেন পেয়ে বেজায় খুশি। যাঁদের টোকেনের নম্বর পিছনের দিকে, তাঁরা বাড়ি চলে গেলেন খুশি মনে। কেউ কেউ দাম পেয়ে বেচেও দিলেন টোকেন। এ রকম একজনের মন্তব্য, ‘‘এক দাদা শুক্রবার অনেকক্ষণ লাইনে থেকেও টাকা তুলতে না পেরে ফিরে গিয়েছিলেন। এ দিনও পরে এসেছেন। কষ্ট হল। তাই টোকেনটা দিয়ে দিলাম।’’ উনি যে টাকা দিলেন আপনাকে? ওই ব্যক্তির জবাব, ‘‘ও তো ভালবেসে দাদা চা খেতে দিলেন। অন্যরকম ভাববেন না।’’ ব্যাঙ্ক ম্যানেজার সুমন্ত দে অবশ্য দাবি করেছেন, ‘‘টোকেনের বিষয়টি সরাসরি ব্যাঙ্কের সঙ্গে জড়িত নয়। বাইরে কী হয়েছে বলতে পারব না।’’

এরা কারা

এক যুবক বাজারের ব্যাগ থেকে ৪০ হাজার টাকা বের করে মানবাজারের একটি ব্যাঙ্কের কাউন্টারে রাখলেন। ২০টি এক হাজার ও ৪০টি পাঁচশো টাকার নোট। ব্যাঙ্ক কর্মী অবাক চোখে বলে ওঠেন, ‘‘এক বছর ধরে আপনার অ্যাকাউন্টে মাত্র দেড়শো টাকা পড়ে রয়েছে। মাঝখানে কোনও লেনদেন হয়নি। এই টাকা কোথায় পেলেন? যুবক জানান, বাড়ি করবেন বলে তিনি জমিয়ে রেখেছিলেন। কথা না বাড়িয়ে তাঁর টাকা অ্যাকাউন্টে জমা করে নেন ব্যাঙ্ক কর্মী। সেই যুবক ব্যাঙ্ক থেকে বেরোতেই স্থানীয় এক ব্যবসাদার তাঁকে আড়ালে ডেকে গেলেন। যুবকের ব্যাঙ্কের পাশবই চালে গেল ব্যবসাদারের ব্যাগে।

লাটে ব্যবসা

ক’দিন ধরেই সাত সকাল থেকে ব্যাঙ্ক, এটিএমের সামনে লম্বা লাইন পড়ছে। আর সেই লাইনের আড়ালে চলে যাচ্ছে রাস্তার পাশের সারি সারি দোকান। এমনিতেই দোকানের সামনে মোটরবাইক বা সাইকেল রাখলে কিছু ব্যবসায়ীর মেজাজ চড়ে যায়। কিন্তু টাকা তুলতে আসা লোকেদের তো আর সেই মেজাজ দেখিয়ে সরানো যায় না! ফলে দিনভর বেচাকেনা মার খাচ্ছে। কিন্তু লাইনও শেষ হচ্ছে না। সব দেখে ব্যবসায়ীদের হা-হুতাশ, ‘‘দোকানের মালপত্র লাইনের আড়ালে চলে যাচ্ছে। ক্রেতারা দেখতে পারছেন না। কবে যে লাইন শেষ হবে!’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy