পর্যটনের মরসুম প্রায় শেষের মুখে। তবে এখনও মুকুটমণিপুরের হোটেল ও সরকারি কটেজে ঠাঁই নাই অবস্থা। তাই মরসুমের শেষবেলায় পর্যটকদের চমক দিতে দোল উৎসবকে বেছে নিল প্রশাসন। খাতড়া মহকুমা প্রশাসন এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর বৃহস্পতিবার মুকুটমণিপুরে আয়োজন করেছে ‘পলাশ উৎসব’।
মহকুমাশাসক (খাতড়া) তনয়দেব সরকার বলেন, “মুকুটমণিপুরে এখনও পর্যটক আসছেন। দোল উৎসব পর্যন্ত এলাকার সরকারি ও বেসরকারি বেশির ভাগ হোটেল ‘বুক্ড’ হয়ে রয়েছে। তাই পর্যটকেরা যাতে এখানেও দোলের আনন্দে মাততে পারেন, সে জন্য পলাশ উৎসবের আয়োজন করেছি আমরা।”
মহকুমাশাসক জানাচ্ছেন, শান্তিনিকেতনের মতোই পলাশ উৎসব গানে-আবিরে রঙিন করতে চাইছেন তাঁরা। সকালে স্থানীয় ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। শেষে জলাধারের সামনে রাস্তার উপরে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। খাতড়ার বেশ কয়েকটি নৃত্য ও সঙ্গীত স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা গীতি আলেখ্য পরিবেশন করবে। সঙ্গে থাকবে আবির খেলা। পর্যটকদের আবির মাখাবে স্থানীয় স্কুলের পড়ুয়ারা।
বস্তুত, চলতি মরসুমে মুকুটমণিপুর পর্যটন কেন্দ্রকে সম্পূর্ণ নতুন রূপে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরেছে প্রশাসন। ২০১৬ সালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নের জন্য গড়ে দিয়েছিলেন মুকুটমণিপুর ডেভেলপমেন্ট কমিটি (এমডিএ)। কমিটির চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন বাঁকুড়ার জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা বসু ও এগজিকিউটিভ অফিসার (ইও) পদে রয়েছেন খাতড়ার মহকুমাশাসক।
এমডিএ-র উদ্যোগে ইতিমধ্যেই মুকুটমণিপুর পর্যটনকেন্দ্রে প্রকাশ্যে ধূমপান, মদ্যপান নিষিদ্ধ হয়েছে। পিকনিকের সময় সাউন্ডবক্স বাজানো বন্ধ করে দিয়ে এলাকায় শব্দ দূষণও নিয়ন্ত্রণ করেছে এমডিএ। পরিচ্ছন্নতার দিকেও এ বার বেশ কিছু অভিনব পদক্ষেপ করা হয়েছে। যার জেরে চলতি পর্যটন মরসুমে কংসাবতী জলাধার সংলগ্ন এলাকার পরিবেশের ভোল পাল্টে গিয়েছে অনেকখানি।
সৌন্দর্যায়নের কাজও হয়েছে মুকুটমণিপুরে। গোটা জলাধার চত্বর পথবাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে সংস্কারের অভাবে পড়ে থাকা জলাধার সংলগ্ন একটি উদ্যানকে নতুন রূপে সংস্কার করা হয়েছে। জলাধারে নৌকা ভ্রমণে এ বার থেকেই ‘লাইফ জ্যাকেট’ পরা বাধ্যতামূলক করেছে এমডিএ। গত ডিসেম্বরে মুকুটমণিপুরে ফানুস উড়িয়ে ‘ফান উৎসব’-এর আয়োজন করে পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পেয়েছিল এমডিএ।
প্রশাসনিক ভাবে দাবি করা হচ্ছে, চলতি মরসুমে পর্যটকদের আনাগোনা কয়েক গুণ ছাপিয়ে গিয়েছে বিগত বছরগুলিকে। এমডিএ-র সমীক্ষায় উঠে এসেছে, গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই পর্যটন কেন্দ্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় দু’কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা আয় হয়েছে। এমডিএ-র তরফে দাবি করা হয়েছে, গত বছর কেবলমাত্র গাড়ি পার্কিং থেকে যেখানে আয় হয়েছিল মেরেকেটে আড়াই লক্ষ টাকা, এ বার সেখান থেকেই আয় ছাপিয়ে গিয়েছে ১২ লক্ষ টাকায়। আয় কয়েক গুণ বেড়েছে জলাধারের নৌকচালক থেকে ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে হোটেল মালিক সকলেরই।
প্রশাসনের দাবির সমর্থন মিলেছে অন্যদের কথাতেও। মুকুটমণিপুর উন্নয়ন পরিষদ নৌকাবিহার সমবায় সমিতির সম্পাদক তারাপদ সিংহ সর্দার বলেন, “অন্যান্যবার জানুয়ারির মধ্যেই মুকুটমণিপুরে ভিড় উধাও হয়ে যেত। তবে এ বার ব্যতিক্রম। এখনও পর্যটকেরা আসছেন। অন্যান্য বারের তুলনায় আমাদের আয়ও অনেক বেড়েছে এ বার।” মুকুটমণিপুরের হোটেল ব্যবসায়ী তাপসকুমার মণ্ডল বলেন, “হোলি পর্যন্ত সব হোটেলের ঘর ‘বুক্ড’ হয়ে রয়েছে। গোটা মরসুম জুড়েই দারুণ জমে ছিল পর্যটন কেন্দ্র। ব্যবসাও বেড়েছে আমাদের।”
মহকুমাশাসক বলেন, “প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যাতে একটা শান্তির এবং মনোরম পরিবেশ পায় সেটা নিশ্চত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল।” জেলাশাসকের আশ্বাস, “আগামী মরসুমে মুকুটমণিপুর পর্যটন কেন্দ্রে আরও বেশ কিছু নতুন নতুন চমক নিয়ে আসতে ইতিমধ্যেই ভাবনাচিন্তা শুরু করেছি আমরা।” রানিবাঁধের বিধায়ক জ্যোৎস্না মান্ডি বলেন, ‘‘লোক সংস্কৃতি উৎসবও মুকুটমণিপুরে করার ভাবনা রয়েছে। আমরা আরও আকর্ষণীয় করতে চাই মুকুটমণিপুরকে।’’