Advertisement
E-Paper

গরমে পাতে থাকুক পান্তা

গ্রীষ্মের রাত। মাটির দাওয়ায় জ্বালানো টিমটিমে লন্ঠন। সেই আলোয়, মাঝে পান্তার হাঁড়ির চারপাশে বসে গোটা একটি পরিবার। গরমের দিনে একসময় গ্রাম বাংলায় অতি পরিচিত ছিল দৃশ্যটি। মুখরোচক খাবারের ভিড়ে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল সেই দৃশ্যটি। গরমের চোটে, এক বড় সংখ্যক পরিবারে ফের দেখা যাচ্ছে সেই দৃশ্য। পোলাও-বিরিয়ানীর কথা শুনলে জিভে জল আসে যেসব ভোজন রসিকদের, তারাও এখন সব ভুলে পান্তা আমানিতেই মন মজিয়েছেন। মাটির হাঁড়ির জায়গা অবশ্য নিয়েছে স্টিল কিংবা অ্যালুমিনিয়ম। লন্ঠনের জায়গায় বিজলী বাতি। কিন্তু পান্তার স্বাদ সেই একই রয়ে গিয়েছে।

অর্ঘ্য ঘোষ

শেষ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০১৬ ০০:৪৭
পাত পেড়ে পান্তা। নানুরের গ্রামে ছবিটি তুলেছেন সোমনাথ মুস্তাফি।

পাত পেড়ে পান্তা। নানুরের গ্রামে ছবিটি তুলেছেন সোমনাথ মুস্তাফি।

গ্রীষ্মের রাত। মাটির দাওয়ায় জ্বালানো টিমটিমে লন্ঠন। সেই আলোয়, মাঝে পান্তার হাঁড়ির চারপাশে বসে গোটা একটি পরিবার।

গরমের দিনে একসময় গ্রাম বাংলায় অতি পরিচিত ছিল দৃশ্যটি। মুখরোচক খাবারের ভিড়ে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল সেই দৃশ্যটি। গরমের চোটে, এক বড় সংখ্যক পরিবারে ফের দেখা যাচ্ছে সেই দৃশ্য। পোলাও-বিরিয়ানীর কথা শুনলে জিভে জল আসে যেসব ভোজন রসিকদের, তারাও এখন সব ভুলে পান্তা আমানিতেই মন মজিয়েছেন। মাটির হাঁড়ির জায়গা অবশ্য নিয়েছে স্টিল কিংবা অ্যালুমিনিয়ম। লন্ঠনের জায়গায় বিজলী বাতি। কিন্তু পান্তার স্বাদ সেই একই রয়ে গিয়েছে।

কিছুটা এলিয়ে পড়া টক-টক পান্তার সেই স্বাদ শৈশবকে মনে পড়িয়ে দিচ্ছে ময়ূরেশ্বরের ঢেকার স্বাধীন মণ্ডল, নানুরের নিমড়ার বিটন খানদের।

‘পান্তা ভাতে নুন জোটে না, বেগুন পোড়ায় ঘি’ কিংবা ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ জাতীয় বহু প্রচলিত আপ্তবাক্য কিংবা প্রবাদই বাঙালির সঙ্গে পান্তার সম্পর্ক কতো আঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত তা প্রমাণ করে। বছর কুড়ি পঁচিশ আগেও গ্রীষ্মে অধিকাংশ বাঙালি হেঁসেলে পান্তা-আমানির কদরই ছিল আলাদা।

সেইসব দিনের কথা আজও লাভপুরের স্বর্ণজোল গ্রামের ষাটোর্দ্ধ বাসন্তী মণ্ডল, ময়ূরেশ্বরের নবগ্রামের বুলু ভাণ্ডারীদের স্মৃতিতে ভাসে। তাঁরা জানান, সেসময় পরিবারের সদস্যদের পাতে পান্তা ভাত বেড়ে দিতাম। সবাই তৃপ্তি করে খেয়ে নিত। শুধু পান্তাভাতই নয়, সরষের তেল এবং নুন মেশানো আমানিও (পান্তা ভাতে মেশানো জল) প্রিয় ছিল সবার। সে সময় তো এতো ঠাণ্ডা পানীয় সহজলভ্য ছিল না। আমানিই ঠাণ্ডা পানীয়ের বিকল্প হিসাবে কাজ করত। তিনি বলেন, ‘‘বৌমারা তো সে সব ভুলতেই বসেছিল। অত্যধিক গরমের জন্য ছেলে-মেয়েদের আবদারে ফের পান্তা তৈরির কৌশল বৌমাদের শিখিয়ে দিলাম। এতে দু’বেলা রান্নার ঝামেলা, খরচও সাশ্রয় হচ্ছে। পেটও ভাল থাকছে।’’

স্বাধীন মণ্ডল, বিটন খানরা জানান, ‘‘ছোটবেলায় মায়ের হাতের পান্তার স্বাদ প্রায় ভুলতেই বসেছিলাম। মাত্রাতিরিক্ত গরমের জন্য কয়েকদিন ধরে ফের সেই স্বাদ ফিরে পেয়েছি। আবহাওয়ার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত অন্তত রাতে পান্তাই খেয়ে যাব।’’ খাইয়ে হিসাবে যথেষ্ট নাম ডাক রয়েছে ময়ূরেশ্বরের কিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, রমেন সরখেলদের। রমেনবাবুরা বলছেন, নিমন্ত্রণ পেলে তাঁরা কোনও ভোজ বাড়ি বাদ দেন না। কিন্তু এ বারেই তার অন্যথা হয়েছে। সম্প্রতি এক বন্ধুর ছেলের বিয়ের ভোজের মেনুতে পোলাও-বিরিয়ানী-সহ লোভনীয় সব পদ আছে জেনেও সেখানে যাননি। বরং বাড়িতে পান্তা ভাতেই তৃপ্ত থেকেছেন। তাঁদের মতে, ‘‘গরমে ওইসব খাবারে পেটের গোলমাল অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু পান্তা-আমানী পেট ঠান্ডা রাখে। রাতে ঘুমও ভাল হয়। তাই এখন পোলাও-বিরিয়ানী পরিবর্তে পান্তা-আমানিই স্বাদ বৈচিত্র পাচ্ছি।’’

নিছক রসনা তৃপ্তিই নয়, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত, গরম ভাতের তুলনায় পান্তার উপকার বেশি। পুষ্টিবিদরাও সেই দাবি উড়িয়ে দিচ্ছেন না মোটে। এক পুষ্টিবিদের দাবি, ‘‘পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ বেশি। দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে। শরীর ঠান্ডা থাকে এই গরমে।’’ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে ১০০ গ্রাম পান্তা ভাতে (১২ ঘণ্টা পর) ৭৩.৯১ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে, গরম ভাতে সেখানে মাত্র ৩.৪ মিলিগ্রাম। এছাড়াও ১০০ গ্রাম পান্তাভাতে ৩০৩ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ৮৩৯ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম এবং ৮৫০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। গরম ভাতে ক্যালসিয়াম মাত্র ২১ মিলিগ্রাম।

প্রায় ১২ ঘণ্টা জলে ভিজে থাকায় স্বল্প অ্যালকোহলের উপস্থিতির জন্য পান্তা ভাত খেয়ে বেশ ঝিমুনি ভাব আসে। তবে, গরমের দিনে পান্তাভাত শরীর ঠাণ্ডা, সতেজ এবং কর্মক্ষম রাখে। শরীরে জলের অভাব দূর করে তাপমাত্রার ভারসাম্যও বজায় রাখে। পেটের রোগ, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য দূর করা-সহ সোডিয়ামের পরিমাণ কম থাকায় রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণও করে পান্তাভাত। চিকিৎসা বিজ্ঞানও মানছে ওই তথ্য।

কলকাতার দুই বিশিষ্ট পেটের রোগ বিশেষজ্ঞ কল্যাণ কুমার ঘোষ এবং সঞ্জয় সরকার বলেন, ‘‘যেহেতু ভাত দীর্ঘ ক্ষণ ভিজিয়ে পান্তা হয় সে জন্য তা অর্ধপাচ্য হয়ে যায়। সহজেই হজম হয়। মশলা এবং তেলযুক্ত পোলাও বিরিয়ানীর থেকে পান্তা অনেক বেশী উপকারি। তবে পান্তাভাত ভালভাবে সংরক্ষণ করা এবং নিদিষ্ট সময়ের মধ্যে খাওয়াটা জরুরী। তবে বেশিদিনের বাসি হওয়াটা ঠিক নয়।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy