বিতর্কের মধ্যে দিয়েই শুরু হল তিনদিনের ‘রাজ্যস্তরের আদিবাসী ভাষায় রচিত একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতা’। বৃহস্পতিবার রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ মন্ত্রী সুকুমার হাঁসদা রাইপুর ব্লক অফিস প্রাঙ্গণে এই প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করলেন। যদিও এই প্রতিযোগিতার নামকে কেন্দ্র করেই বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। আদিবাসীদের সংগঠন ভারত জাকার্ত মাজহি পারগানা মহলের তরফে রাইপুরের বিভিন্ন জায়গায় পোস্টার সাঁটিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
ওই সংগঠনের দাবি, প্রতিযোগিতার নামেই গলদ রয়েছে। ‘আদিবাসী ভাষা’ বলে কিছুই হয় না। আদপে একাধিক প্রাচীন জনজাতীকে একত্রিত ভাবে আদিবাসী পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে সাঁওতালি, মুন্ডারি, কোল, ভিল, হৌ- এর মতো বিভিন্ন সম্প্রদায়ের একাধিক জনজাতি রয়েছে। প্রত্যেকটি জাতির ভাষা আলাদা। সংস্কৃতি ও ধর্মও আলাদা। ভাষাগুলিরও নাম পৃথক পৃথক।
যেমন সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ভাষাকে বলা হয় সাঁওতালি। এই প্রতিযোগিতায় আদিবাসী ভাষা বলতে ঠিক কোন ভাষাকে বোঝানো হচ্ছে তা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে ভারত জাকার্ত মাজহি পারগানা মহল। সংগঠনের জেলা সম্পাদক (গোডেৎ) রবিনাথ মান্ডি বলেন, “আদিবাসী ভাষায় রচিত নাটক না বলে যদি বলা হতো ‘আদিবাসী জনজাতির নিজস্ব ভাষায় রচিত নাটক’ তাহলে এর একটা সুনির্দিষ্ট মানে পাওয়া যেত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আদিবাসী ভাষা বলতে কোন ভাষাকে বোঝানো হচ্ছে তা নিয়েই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এটা নিন্দনীয়।”
তিনি জানাচ্ছেন, সংগঠনের তরফে রাইপুরের বিডিও দীপঙ্কর দাসকে ফোন করে অনুষ্ঠানের নাম সংশোধন করতে বলেছিলেন। বাঁকুড়ায় এসে জেলার শীর্ষ কর্তাদের কাছেও মৌখিক ভাবে তাঁরা বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত কোনও স্তর থেকেই তাঁদের দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি দেখে তাঁরা এলাকায় পোস্টার সাঁটিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
বস্তুত, এই নাটক প্রতিযোগিতার এ বার ২১তম বর্ষ। গত বছর এই প্রতিযোগিতা হয়েছিল পুরুলিয়া জেলায়। বাঁকুড়া জেলাতেও এর আগে এই প্রতিযোগিতা হয়েছে বলেই জানাচ্ছেন প্রশাসনিক আধিকারিকেরা। প্রতিবারই ‘আদিবাসী ভাষায় রচিত একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতা’ নামেই এই অনুষ্ঠান হয়েছে। অথচ আগে কেন এ নিয়ে বিতর্ক হয়নি তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে জেলা প্রশাসনের অন্দরে।
জেলা অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দফতর ও আদিবাসী উন্নয়ন দফতরের জেলা প্রকল্প আধিকারিক স্বরূপ সিকদারের কথায়, “রাজ্য থেকে যে নাম ঠিক করে দেওয়া হয় তা জেলায় পরিবর্তন করা যায় না। দু’দশক ধরে এই নামেই তো এই প্রতিযোগিতা হচ্ছে। কারও আপত্তি থাকলে রাজ্যস্তরে বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানানো উচিত।”
একই কথা বলছেন রাইপুরের বিডিও দীপঙ্কর দাসও। তাঁর কথায়, “এলাকায় পোস্টার পড়েছে শুনেছি। কিন্তু নাম পরিবর্তন করার অধিকার আমাদের নেই।” আগে কেন নাম নিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়নি? রবিনাথবাবুর কথায়, “এই জেলায় এই প্রতিযোগিতা আগে হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। অন্যান্য জেলায় হয়তো বিষয়টি নজরে আসেনি। তবে ওই নাম পরিবর্তনের জন্য আগামী পদক্ষেপ কী হবে তা পরে ঠিক করব।”
রাজ্যস্তরের এই প্রতিযোগিতায় মোট ১৫টি জেলার দল যোগ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিডিও দীপঙ্করবাবু। প্রতিদিন পাঁচটি করে দল নাটক মঞ্চস্থ করবে। শেষ দিন প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করবেন বিচারকেরা।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন মঞ্চে অবশ্য মন্ত্রী সুকুমারবাবু বিতর্ক নিয়ে কোনও কথা বলেননি। বরং রাজ্যে পালাবদলের পর জঙ্গলমহল এলাকায় ও আদিবাসী মানুষদের যে উন্নয়ন হয়েছে তাই তুলে ধরেছেন তিনি। পরে ফোন করা হলে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘আদিবাসীদের ভাষা বলতে সমস্ত আদিবাসী ভাষাকেই বোঝানো হয়েছে। অহেতুক একটা বিষয় নিয়ে শুধুমাত্র বিরোধিতা করার জন্যই এই পোস্টার সাঁটানো হয়েছে।’’
মন্ত্রী এমনটা দাবি করলেও অাসেকার সম্পাদক প্রধাম মুর্মু দাবি করেছেন, ‘‘সাঁওতালি হরফ অলচিকিকে এখন অনেকে ‘অলচিকি ভাষা’ বলে ভুল করেন। তেমনই আদিবাসী ভাষা বলেও আলাদা করে কিছু নেই। আগের সরকার আদিবাসী ভাষার নাটকের প্রতিযোগিতার ভুল নাম করেছিল। এই সরকারের অন্তত তা সংশোধন করা দরকার।’’ যদিও অনেকে মনে করছেন, আদিবাসী ভাষা বলতে হয়তো সামগ্রিক ভাবে আদিবাসীদের সমস্ত ভাষাকেই বোঝানো হয়েছে।